ঢাকা সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ইরান যুদ্ধের ফাঁদে যুক্তরাষ্ট্র, বের হওয়ার সব পথ ঝুঁকিপূর্ণ

কালের সমাজ ডেস্ক | মে ১৮, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম ইরান যুদ্ধের ফাঁদে যুক্তরাষ্ট্র, বের হওয়ার সব পথ ঝুঁকিপূর্ণ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর এবং একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইরান ইস্যু ওয়াশিংটনের জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গভীর কৌশলগত সংকটে পরিণত হয়েছে। মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট, যাকে “কৌশলগত অচলাবস্থা” বলা যায়। দেশটির জন্য এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যা অনেক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকও স্বীকার করতে শুরু করেছেন।

কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফির বক্তব্য এই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কোনো অচলাবস্থা নয়, বরং “আমেরিকার জন্য একটি বিপর্যয়” হবে। সিএনএনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান এখনো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার বড় অংশ ধরে রেখেছে এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও বজায় রেখেছে।

ইসরায়েলপন্থী লবির ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর পথে যেতে পারে। তবে গত দুই দশকের ব্যয়বহুল মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি বড় অংশ বিশেষত ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়ানোর বিরুদ্ধে সরব করেছে।

যদি ট্রাম্প প্রশাসন আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা ডেমোক্র্যাট ও সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়বে। সমালোচকরা এটিকে অতীতের ব্যর্থ ও কৌশলগতভাবে ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি হিসেবে তুলে ধরবে।

অন্যদিকে, কূটনৈতিক পথও রাজনৈতিক ঝুঁকিমুক্ত নয়। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি সাধারণত রিপাবলিকান পার্টির একটি অংশ এবং ইসরায়েলঘনিষ্ঠ লবি নেটওয়ার্কের তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) দেখিয়েছিল, কীভাবে এসব গোষ্ঠী তেহরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতাকে বড় রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ দিতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা উত্তেজনা প্রশমন নীতির দিকে এগোয়, তবে বিরোধীরা সেটিকে দুর্বলতা বা আত্মসমর্পণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। তাদের বর্ণনায় দেখানো হবে, দীর্ঘদিন চাপ ও হুমকির পর শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হয়েছে।

মার্কিন দলীয় রাজনীতির বর্তমান পরিবেশে বিদেশি প্রতিপক্ষের প্রতি সামান্য দুর্বলতার ধারণাও দ্রুত রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে তৃতীয় বিকল্প হলো—না কোনো চুক্তি করা, না সরাসরি সংঘাতে যাওয়া; বরং ইরান ইস্যুকে ঝুলিয়ে রাখা। কিন্তু এই পথও কৌশলগত ঝুঁকি বহন করে। ওয়াশিংটনের কিছু বিশ্লেষকের মতে, বিষয়টিকে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখলে ইরান তার নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতা নতুনভাবে পুনর্মূল্যায়ন ও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তিনটি প্রধান বিকল্প- সংঘাত বাড়ানো, সমঝোতায় যাওয়া, কিংবা বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা—প্রত্যেকটিরই নিজস্ব খরচ ও ঝুঁকি রয়েছে।

ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি যে দুটি জিনিসের অভাবে ভুগছে তা হলো—অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য এবং দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক সমর্থন।

যদি ওয়াশিংটন সামরিক চাপ বা হামলার পথে এগোয়, তবে ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থন পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বরং অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ইউরোপ ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই বেশি ঝুঁকে থাকে এবং উচ্চঝুঁকির সামরিক সংঘাত নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক।

আঞ্চলিক পর্যায়ে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও উত্তেজনা কমানো এবং নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগী। ফলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃহত্তর সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করবে না।

অন্যদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়ার অবস্থানও ওয়াশিংটনের থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। তারা ইরান ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখতে চায় না।

সব মিলিয়ে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে কোনো বিকল্পই সহজ বা ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া যেকোনো পদক্ষেপের রাজনৈতিক বৈধতা ও বাস্তবায়ন ব্যয় উভয়ই বেড়ে যাবে।

এই আন্তর্জাতিক বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ওয়াশিংটনের কৌশলগত অচলাবস্থাকে আরও গভীর করেছে। ফলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, অতীতের একতরফা নীতির মাধ্যমে আর ইরান ইস্যু মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য, পদ্ধতি এবং প্রত্যাশিত ফলাফল—সবকিছুর বাস্তবসম্মত পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন। সূত্র: মেহের নিউজ

Link copied!