ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

অস্তিত্ব সংকটে পদ্মফুল

জেলা প্রতিনিধি, মাগুরা | জুন ৫, ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম অস্তিত্ব সংকটে পদ্মফুল

বাংলার প্রকৃতি যেন এক বিশাল রঙতুলি। নদী, বিল, হাওড়, বাওড় আর জলাভূমির বুকে যুগ যুগ ধরে যে সৌন্দর্য নিঃশব্দে রচনা করেছে তার অন্যতম অনুষঙ্গ পদ্মফুল। 

জলজ উদ্ভিদের এই রাণী একসময় বর্ষা ও শরৎজুড়ে গ্রামীণ বাংলার জলাশয়, বিল-ঝিলকে সাজিয়ে তুলত গোলাপি ও সাদা রঙের অপরূপ আভায়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জলাশয় ভরাট, দূষণ ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে প্রকৃতির এই অনন্য সৃষ্টি।

এক সময় গ্রামের বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে ফুটে থাকা পদ্মফুল ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। দূর থেকে তাকালে মনে হতো, সবুজের বুক চিরে গোলাপি-সাদা রঙের এক স্বপ্নরাজ্য ভেসে আছে পানির ওপর। এখন সেই দৃশ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। জাতীয় ফুল শাপলার দেখা মিললেও পদ্মফুলের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে শুভ্রতার প্রতীক সাদা পদ্ম এখন অনেক এলাকায় প্রায় বিলুপ্তির পথে।

পদ্মফুল হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের অনেক স্মৃতিও। একসময় বর্ষার পানিতে টইটম্বুর বিলে শিশু-কিশোররা দল বেঁধে নেমে পড়ত পদ্ম তুলতে। কেউ নৌকায়, কেউ সাঁতরে পৌঁছে যেত ফুলের কাছে। পদ্মের কলি, পাপড়ি কিংবা বড় বড় পাতাকে ঘিরে চলত আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সেই নিবিড় সম্পর্ক আজ অনেকটাই অতীত।

প্রকৃতিবিদদের মতে, বিল-ঝিল ও জলাভূমির স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হওয়ার কারণেই পদ্মের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, জলাশয় ভরাট এবং ইজারা ভিত্তিক মাছ চাষের বিস্তারের ফলে পদ্মের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

তবে এই হতাশার মধ্যেও আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পাল্লা গ্রাম। মহম্মদপুর-বাবুখালী বেড়িবাঁধ সড়কের পাশে অবস্থিত হাসান জাভেদ ইকবালের একটি পুকুরে প্রতি বছরের মতো এবারও ফুটেছে অসংখ্য পদ্মফুল। সবুজ পাতার ফাঁকে মাথা উঁচু করে থাকা গোলাপি-সাদা ফুল ও কলির সমারোহ যে কোনো দর্শনার্থীকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ২৫ বছর ধরে এই পুকুরে নিয়মিত পদ্মফুল ফুটে আসছে। মৌসুমের সময় প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন এই নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে।

বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পদ্মফুলের সম্পর্কও গভীর। সংস্কৃতে এর সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কমল, পঙ্কজ, সরোজ, সরসিজ, নীরজসহ অসংখ্য নামের প্রচলন রয়েছে। কবিতা, গান ও লোকজ সংস্কৃতিতে পদ্ম চিরকালই প্রেম, পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে স্থান পেয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অনেক কবি-সাহিত্যিক তাঁদের সৃষ্টিতে পদ্মকে অমর করে রেখেছেন।

পাল্লা গ্রামের বাসিন্দা শ্রীমন্ত বসু স্মৃতিচারণ করে বলেন, “পদ্মের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শৈশবের। আমাদের গ্রামে একটি নতুন পুকুরে পদ্ম চাষ করা হয়েছিল। স্কুলের ফাঁকে বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই সেখানে ফুল দেখতে যেতাম। বড় বড় পদ্মপাতা আর ফুটন্ত ফুল আমাদের ভীষণ আকর্ষণ করত। এখন আর আগের মতো পদ্ম দেখা যায় না। তবে গ্রামের সেই পুকুরে এখনও পদ্মফুল ফোটে, আর সেটাই আমাদের কাছে অনেক বড় আনন্দ।”

সচেতন মহলের অভিমত, এখনই যদি প্রাকৃতিক জলাশয়, ঐতিহ্যবাহী পদ্মপুকুর ও বিল সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম প্রকৃতির এই অপূর্ব সৌন্দর্যকে শুধু বইয়ের পাতায় কিংবা ছবিতেই দেখতে পাবে। বাংলার জলাভূমিতে পদ্মের রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সমন্বিত সংরক্ষণ উদ্যোগ, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ। আজো কোথাও কোথাও ফুটে থাকা পদ্মফুল যেন নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে বাঁচানো মানেই আমাদের শেকড়, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখা।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!