ঢাকা বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

খেজুর কাঁধিতে দুই শিশুর শৈশবের সোনাঝরা দিন

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | জুন ১০, ২০২৬, ০৫:১১ পিএম খেজুর কাঁধিতে দুই শিশুর শৈশবের সোনাঝরা দিন

জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ়ের সন্ধিক্ষণে বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতিতে এক সময় দেখা মিলত এক চিরচেনা দৃশ্যের। মাঠের আইল, পুকুরপাড়, পতিত জমি কিংবা বাড়ির আঙিনায় মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দেশি খেজুর গাছগুলোর কাঁধিতে ভরে উঠত থোকা থোকা পাকা খেজুরে। হলুদ, কমলা ও লালচে রঙের সেই ফল শুধু একটি মৌসুমি খাদ্যই ছিল না, ছিল গ্রামীণ শৈশব, আনন্দ ও লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে।
এক সময় দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় অসংখ্য দেশি খেজুর গাছ দেখা গেলেও বর্তমানে নগরায়ণ, কৃষিজমির পরিবর্তন এবং দেশীয় বৃক্ষরোপণে অনীহার কারণে এ গাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক শিশুই দেশি খেজুরের স্বাদ ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

প্রবীণদের স্মৃতিচারণে এখনো ভেসে ওঠে খেজুর পাড়ার সেই সোনালি দিনগুলো। দুপুরের রোদ কিংবা বিকেলের আলোয় একদল শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা করে খেজুর গাছে উঠত। কার ঝুড়ি বা থলেতে বেশি খেজুর জমবে, তা নিয়ে চলত আনন্দঘন প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

শুধু শিশুদের মধ্যেই নয়, বড়দের মধ্যেও ছিল খেজুরকে ঘিরে আলাদা উচ্ছ্বাস। অনেকেই আস্ত কাঁধিসহ খেজুর পেড়ে আনতেন। পরে সামান্য লবণ মেশানো পানি ছিটিয়ে সেগুলো ঝুলিয়ে রাখা হতো। একদিন পরই খেজুরগুলো টসটসে লাল রঙ ধারণ করত। সেই মিষ্টি ও হালকা কষযুক্ত স্বাদ আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।

সম্প্রতি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার লক্ষীপুর গ্রাম থেকে তোলা একটি দৃশ্য যেন সেই হারিয়ে যেতে বসা শৈশবকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সেখানে দুটি শিশু একটি খেজুর গাছে উঠে কাঁধিভর্তি পাকা খেজুর পাড়ছে। তাদের সেই আনন্দঘন মুহূর্ত গ্রামীণ জীবনের বহুদিনের পরিচিত এক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দিয়েছে। ছবিটি মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনের ভিড়েও প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি।

গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা দেশি খেজুর শুধু একটি ফল নয়, এটি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যেরও অংশ। খেজুর তলায় ঝরে পড়া ফল কুড়িয়ে খাওয়া, আঁচল বা পকেটভর্তি করে বাড়ি ফেরা, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়ার মতো অসংখ্য স্মৃতি এখনও অনেক মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছে।

তবে বাস্তবতা হলো, আধুনিকতার প্রবল স্রোতে এসব দৃশ্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের অবসর সময় এখন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে মোবাইল ফোন, ট্যাব ও বিভিন্ন ডিজিটাল পর্দার মধ্যে। ফলে প্রকৃতিনির্ভর শৈশবের অভিজ্ঞতাও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গাছপালা ও গ্রামীণ ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় পড়ে জানবে দেশি খেজুরের কথা, কিন্তু কখনো অনুভব করতে পারবে না গাছের ডালে ঝুলে থাকা পাকা খেজুরের হাতছানি কিংবা ধুলোবালি মাখা সেই সোনালি শৈশবের স্বাদ।

কালের সমাজ/কে.পি

 

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!