জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) নাম, ঠিকানা কিংবা পারিবারিক তথ্যের ভুল সংশোধনের জন্য উপজেলা নির্বাচন অফিসে এসে দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সাধারণ ভোটাররা। কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে দিনের পর দিন অফিসে ঘুরেও সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন অনেক সেবাপ্রার্থী। তাঁদের অভিযোগ, সংশোধন কার্যক্রমে অযৌক্তিক বিলম্ব, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং ঘুষ ছাড়া কাজ না হওয়ার সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ১১ হাজার। বিপুলসংখ্যক ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের বানান ভুল, পিতা মাতার নামের অসঙ্গতি, জন্মতারিখ ও ঠিকানাগত ত্রুটিসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কারণে নিয়মিত সংশোধনের আবেদন জমা পড়ে।
তবে এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সেবাপ্রার্থীরা। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, এনআইডি সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তাঁদের বারবার অফিসে আসতে বলা হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেখা পাওয়া যায় না। অনেক সময় উপজেলা অফিস থেকে জেলা নির্বাচন অফিসে, আবার কখনও ঢাকার নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এতে সময়, শ্রম ও অর্থ সবকিছুরই অপচয় হচ্ছে। সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, নির্বাচন অফিসে সেবার মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো তদারকি নেই। দূরবর্তী এলাকা থেকে ভাড়া খরচ করে এসে দিনের অধিকাংশ সময় অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। তাঁদের মতে, একটি মৌলিক নাগরিক সেবা পাওয়ার জন্য এত দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভুক্তভোগী ফুলমালা আক্তার অভিযোগ করেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম সংশোধনের আবেদন করার পর তাঁর কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে ৭ হাজার টাকায় কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “আমি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আমার আবেদন নিয়ে টালবাহানা করা হয়। এমনকি আমার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণও করা হয়েছে। সরকারি সেবা পেতে যদি ঘুষ দিতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার কোথায়?আরেক ভুক্তভোগী নীলুফা বেগম বলেন,একটি ভুল সংশোধনের জন্য কয়েক মাস ধরে অফিসে ঘুরছি।
প্রতিবারই নতুন কোনো কাগজপত্র বা অন্য কোনো অজুহাত দেখানো হয়। কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান মিলছে না। সাধারণ মানুষকে এভাবে হয়রানি করা অত্যন্ত দুঃখজনক। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্বাচন অফিসে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতামূলক আচরণ করা হয় না। ফলে নাগরিক সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে মানুষকে মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। তাঁদের দাবি, উপজেলা পর্যায়েই অধিকাংশ সংশোধন কার্যক্রম সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষকে অযথা জেলা বা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছোটাছুটি করতে না হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসের সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সাবিহা ইয়াসমিন বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, নির্ধারিত নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ক্যাটাগরির আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ঘুষ গ্রহণ, দুর্ব্যবহার কিংবা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। আমরা নিয়ম অনুযায়ী সেবা দিয়ে থাকি।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম জয় বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন,সরকারি অফিসে সময়মতো উপস্থিতি, সেবার মান বজায় রাখা এবং নাগরিকদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা প্রত্যেক কর্মকর্তার বাধ্যবাধকতা। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসকে ঘিরে সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ভিন্নমত উঠে এলেও বাস্তবতা হলো জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে এখনও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর তদারকি, জবাবদিহিতা এবং সেবাপ্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা গেলে এ ধরনের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে নাগরিক আস্থাও বৃদ্ধি পাবে সরকারি সেবাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি।
কালের সমাজ/কে.পি

