ঢাকা বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফাইতং দূর্গম পাহাড়ে সাফল্যের পথে সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়

বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি | আগস্ট ১২, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম ফাইতং দূর্গম পাহাড়ে সাফল্যের পথে সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়

পার্বত্য জেলার বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ সীমাহীন সংকট, শিক্ষকদের ত্যাগ আর শিক্ষার্থীদের অদম্য স্বপ্নে ৭৫ শতাংশ এসএসসি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ সোনাইছড়ি। চারদিকে পাহাড়, আঁকাবাঁকা দুর্গম পথ, যোগাযোগের নানা সীমাবদ্ধতা। সন্ধ্যা নামলেই অনেক ঘরে নেমে আসে অন্ধকার। বিদ্যুতের আলো এখনো পৌঁছায়নি বহু পরিবারের ঘরে। এমন বাস্তবতায় কেরোসিনের কুপির ক্ষীণ আলোয় বই খুলে বসে শিক্ষার্থীরা। সেই আলোতেই তারা দেখে বড় হওয়ার স্বপ্ন, শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। এই প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। এটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। দুর্গম পাহাড়ি জনপদের মানুষের কাছে এটি আশার আলো, ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

অভাব, অবকাঠামোগত সংকট, যোগাযোগের দুর্ভোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা এবং নানা সীমাবদ্ধতা সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে বিদ্যালয়টি এগিয়ে চলছে। আর সেই পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। নিজেদের নানা সংকটের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাঁরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।কুপির আলোয় পড়াশোনা, চোখে বড় স্বপ্ন সোনাইছড়ির অনেক পরিবারের জীবনযাত্রা এখনো আধুনিকতার পূর্ণ সুযোগ- সুবিধার বাইরে। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর পড়াশোনার জন্য অনেক শিক্ষার্থীকে নির্ভর করতে হয় কেরোসিনের কুপির ওপর। একদিকে কুপির স্বল্প আলো, অন্যদিকে পাহাড়ি জনপদের নানা প্রতিকূলতা। তবুও বই-খাতা নিয়ে বসে পড়ে তারা। কারণ তাদের চোখে স্বপ্ন আছে। তারা বিশ্বাস করে, শিক্ষা তাদের জীবনের বাস্তবতা বদলে দিতে পারে।কুপির আলো হয়তো ক্ষীণ, কিন্তু সেই আলোয় জ্বলে ওঠা স্বপ্নগুলো অনেক বড়। কোনো শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চায়, কেউ সরকারি চাকরিতে যেতে চায়, কেউবা সমাজের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখে। সীমাবদ্ধতা তাদের স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারেনি।নেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, তবুও চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।বিদ্যালয়টিতে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সুযোগ-সুবিধাই অপ্রতুল। ভালো বসার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এবং কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক মানসম্মত শিক্ষক—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে সীমাবদ্ধতা।

দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থাও বিদ্যালয়ের জন্য একটি বড় সমস্যা। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া অনেক সময় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।তারপরও শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই প্রতিদিন বিদ্যালয়ের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা,শিক্ষকদের ত্যাগের গল্প।একটি বিদ্যালয়ের সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।যাঁরা প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠদান করেন, তাঁদের নিজেদের জীবনেও রয়েছে নানা সংকট। অনেক সময় নিয়মিত ও যথাযথ বেতন-ভাতা না পাওয়ার মতো পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

কিন্তু ব্যক্তিগত কষ্টকে শিক্ষার্থীদের সামনে বড় হতে দেননি তাঁরা। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন থেমে না যায়, সে জন্য নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।তাঁদের কাছে শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি যেন একটি সামাজিক দায়িত্ব। পাহাড়ি এই জনপদের সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন, সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে তাঁরা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রতিকূলতার মাঝেও আশার আলো।একটি বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা যখন সীমিত, তখন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করাও সহজ নয়। কিন্তু সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির পাশের হার ৭৫ শতাংশ।দুর্গম পাহাড়ি এলাকার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ফলাফল নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে যেখানে অনেক শিক্ষার্থীকে কেরোসিনের কুপির আলোয় পড়াশোনা করতে হয়, যেখানে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি রয়েছে—সেখানে ৭৫ শতাংশ পাসের হার একটি বড় অর্জন।এই ফলাফল শুধু পরীক্ষার খাতায় পাওয়া নম্বরের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের রাত জেগে পড়াশোনা, অভিভাবকদের প্রত্যাশা, শিক্ষকদের নিরলস পরিশ্রম এবং একটি দুর্গম জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

এই সাফল্য কার?সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের এই সাফল্যকে শুধু শিক্ষার্থীদের অর্জন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ফুটে ওঠে না।এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে শিক্ষকদের শ্রম ও ত্যাগ। রয়েছে অভিভাবকদের সহযোগিতা। রয়েছে শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়। রয়েছে বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত শুভাকাঙ্ক্ষী ও সহযোগী মানুষের অবদান।যাঁরা সীমিত সামর্থ্য নিয়েও বিদ্যালয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যাঁরা শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়েছেন, যাঁরা নানা সংকটের মধ্যেও শিক্ষার পরিবেশ ধরে রাখতে সহযোগিতা করেছেন তাঁদের প্রত্যেকের অবদান এই সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।পাহাড়ের বুক থেকে বদলে যেতে পারে একটি প্রজন্ম,শিক্ষা শুধু একটি পরীক্ষায় পাস করার বিষয় নয়। শিক্ষা একটি পরিবারকে বদলে দিতে পারে, একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে, এমনকি একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করে দিতে পারে।সোনাইছড়ির মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি বিদ্যালয় সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। এখানকার একটি শিক্ষার্থী যখন উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়, একটি পরিবার তখন নতুন আশার আলো দেখে। একজন শিক্ষার্থী যখন ভালো ফলাফল করে, তখন তার সহপাঠীদের মধ্যেও নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়।

আজ যে শিক্ষার্থী কেরোসিনের কুপির আলোয় পড়াশোনা করছে, আগামী দিনে হয়তো সেই শিক্ষার্থীই হবে শিক্ষক, কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা সমাজের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশার মানুষ।তাই সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিটি সাফল্য শুধু একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য নয়; এটি একটি জনপদের সম্ভাবনার বার্তা।প্রয়োজন আরও সহযোগিতা।সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের এই সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সরকারি- বেসরকারি উদ্যোগ এবং সমাজের বিত্তবান ও শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষের সহযোগিতা।বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শিক্ষা উপকরণ, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা গেলে এই বিদ্যালয়ের ফলাফল আরও ভালো হতে পারে।বিশেষ করে শিক্ষকদের নিয়মিত ও যথাযথ বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষক যখন নিশ্চিন্ত মনে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তখন তার ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ, বৃত্তি ও অন্যান্য সহায়তা বাড়ানো গেলে ঝরে পড়ার হারও কমানো সম্ভব।

কেরোসিনের কুপির আলো একদিন বিদ্যুতের আলোয় বদলাবে।সোনাইছড়ির বাস্তবতা এখনো কঠিন। অনেক ঘরে বিদ্যুতের আলো নেই। অনেক পরিবারকে এখনো নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে জীবন কাটাতে হয়।কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেই শিক্ষার যে আলো জ্বলেছে, সেটিই সবচেয়ে বড় আশার কথা।একটি কেরোসিনের কুপি হয়তো একটি ঘরকে অল্প সময়ের জন্য আলোকিত করতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষিত মানুষ একটি পরিবার, একটি সমাজ এমনকি একটি প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারেন।সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় সেই আলোরই বাহক।এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৭৫ শতাংশ পাসের ফলাফল প্রমাণ করেছে—সুযোগ-সুবিধার অভাব থাকলেও স্বপ্নের অভাব নেই। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়েও সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।আজ কেরোসিনের কুপির ক্ষীণ আলোয় যে শিক্ষার্থীরা বই খুলে বসে, তাদের চোখের স্বপ্ন একদিন আরও উজ্জ্বল হবে—এমন প্রত্যাশাই সোনাইছড়ির মানুষের।সোনাইছড়ির পাহাড়ে শিক্ষার এই আলো আরও ছড়িয়ে পড়ুক। কুপির ক্ষীণ আলো একদিন পরিণত হোক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আলোয়। আর এই দুর্গম জনপদ থেকে উঠে আসুক একটি শিক্ষিত, আত্মনির্ভর ও সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম—এটাই হোক সোনাইছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের আগামী দিনের অঙ্গীকার বলে জানান তারা।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!