মাগুরার বহুল আলোচিত ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আসামি হিটু শেখের (৪৭) মৃত্যুদন্ডের আদেশ বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) ও আসামির আপিল আবেদন শুনানি শেষে সোমবার (৩১ আগস্ট) বেলা ১২টার দিকে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এ রায়ে বিচারপ্রার্থী পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে সন্তোষ লক্ষ্য করা গেছে। এর আগে গত ২৫ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে সময় পিছিয়ে বিচারক আজকের দিন নির্ধারণ করেছিলেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির এবং ইমাম হোসেন তারেক। আসামি হিটু শেখের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত বছরের ৫ মার্চ রমজানের ছুটিতে মাগুরা সদর উপজেলার নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে যায় শিশু আছিয়া। সেদিন রাতেই বোনের শ্বশুর হিটু শেখ শিশুটির ওপর নির্মম পাশবিক নির্যাতন চালান এবং তাকে হত্যার চেষ্টা করেন। গুরুতর অবস্থায় আছিয়াকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। এই নৃশংস ঘটনাটি সমগ্র দেশকে নাড়া দেয় এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিবাদ ও মানববন্ধনের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় নিহত শিশুটির মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চার জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে পুলিশ। ২৩ এপ্রিল আসামিদের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালত অভিযোগ গঠন করেন এবং ২৭ এপ্রিল শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী তাদের জবানবন্দি দেন। ১৩ কার্যদিবসের মধ্যে সাক্ষগ্রহণ ও যুক্তিতর্কসহ পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। গত বছরের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদন্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন-নিহত শিশুর বোনের স্বামী সজীব শেখ (১৯), সজীব শেখের ছোট ভাই রাতুল শেখ (১৭) এবং সজীব শেখের মা জাহেদা বেগম (৪০)। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদন্ড হলে তা অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২১ মে মামলার নথি হাইকোর্টে আসে।
যাচাই-বাছাই শেষে বিজি প্রেসে পেপারবুক তৈরি করে গত ৮ জুন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেয়া হয়। পরবর্তীতে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হলে বিশেষায়িত বেঞ্চে শুনানি শেষে সোমবার আদালত নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদন্ডের রায় অপরিবর্তিত রেখে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন। রায় ঘোষণার পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার বলেন, “আজকে ফাঁসির রায় বহাল ঘোষণা করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত হিটু শেখের ফাঁসি কার্যকর না হবে, ততক্ষণ আমি শান্তি পাবো না। যখন শুনতে পাবো হিটু শেখের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছে, তখন আমি খুশি হব এবং এলাকাবাসীও খুশি হবে।
কালের সমাজ/কে.পি

