কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলায় চারজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। গত ২০ অক্টোবর কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
অভিযোগপত্রে সাইফুল ইসলাম তুহিন, মোজাফ্ফর হোসেন ফাহাদ ও কামরুল হাসানকে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, সিয়াম নামে আরেকজনের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চার অভিযুক্তকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় প্রাপ্তবয়স্ক দুজন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুজন গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. লুৎফর রহমান অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের ৩১ দিনের মধ্যে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এ মামলায় অভিযুক্ত চারজনের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে বাধা, এরপর হত্যা
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার একটি নির্জন বনে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল ইসলাম তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকায় যায়। সেখানে তার আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। এ নিয়ে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। এতে তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিয়ে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত, উদ্ধার আইফোন
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে শনাক্ত করে পুলিশ। পরে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদ ও কামরুলকে শনাক্ত করে আটক করা হয়।
পরবর্তী সময়ে তুহিনের বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় হত্যাকাণ্ডে চারজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নিখোঁজের পরদিন উদ্ধার হয় মরদেহ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়।
পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়সংলগ্ন একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার হত্যা মামলা করেন।
দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা পরিবারের
অভিযোগপত্র দাখিলের পর অপ্রতিমের পরিবার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানিয়েছে। অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ছেলেকে ঘিরেই তাঁদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন হত্যাকারীরা কেড়ে নিয়েছে। তিনি দ্রুত বিচার এবং অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করেন। একই সঙ্গে বয়সের ব্যবধানের কারণে কেউ যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, সেই প্রত্যাশাও জানান তিনি।
পুলিশের অভিযোগপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে মামলাটির তদন্তপর্বে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। এখন আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার এগিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে অপ্রতিমের পরিবার।
কালের সমাজ/কে.পি

