বাইরে থেকে দেখতে আর দশটি সাধারণ সেলুনের মতোই মনে হয়। কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। দেয়ালে দেয়ালে নানা কবিতা, ছন্দ আর অনুপ্রেরণামূলক বাক্য। কাঁচি-চিরুনির পাশাপাশি সুন্দর করে সাজানো সারি সারি বই। ক্ষৌরকর্মের অপেক্ষায় থাকা মানুষের হাত স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে নয়, বরং রূপান্তর ঘটছে বইয়ের পাতায়।
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া শিকদারের মোড়ে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানটির নাম-‘রাজু সেলুন জোন’। ২৪ বছর বয়সী রাজু আহম্মেদের জীবন সংগ্রাম মোটেও সহজ ছিল না। বাল্যকালেই মাকে হারানো রাজু পড়ালেখা বেশি দূর চালাতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০১৭ সালের ২১ মার্চ শুরু ‘রাজু সেলুন জোন’-এর সূচণা করেন। কিন্তু ২০২১ সালে ঘটে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। প্রতিবেশী এক ব্যক্তি তাঁকে ‘নাপিত’ ও ‘অশিক্ষিত’ বলে কটূক্তি করেন। সেই অবহেলা ও অপমানের তীব্র আঘাত রাজুকে হতাশায় ডুবিয়ে দেয়নি, বরং পরিণত হয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিতে। ক্ষোভ থেকে তিনি দোকানের নাম কিছুটা পরিবর্তন করে ‘অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন’ করেন।
তবে শুধু নামেই সীমাবদ্ধ থাকেননি রাজু; প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জ্ঞান ছড়ানোর। ২০১৭ সালের শেষের দিকে কাস্টমারদের বোরিং সময় দূর করতে মাত্র ছয়টি বই দিয়ে শুরু করা সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ শতাধিক বইয়ের এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে রূপ নিয়েছে। ইসলামী বই, ছোটগল্প, উপন্যাস আর কবিতার সংগ্রহশালা; এই দোকানে এখন এসে ভিড় জমান স্থানীয় জ্ঞানপিপাসুরা। রাজুর এই মহতী উদ্যোগ দেখে অনেকে আবার নিজ উদ্যোগে বই উপহারও দিচ্ছেন।
জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি রাজু গড়ে তুলেছেন মানবিকতার এক অনন্য নজির। এতিম শিশুদের জন্য এখানে চুল কাটা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও খতিবদের দেয়া হয় ৫০ শতাংশ ছাড়, আর প্রবীণদের জন্য রয়েছে বিশেষ সম্মানজনক সুবিধা। এছাড়া তাঁর হাত ধরে তৈরি হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন দক্ষ কারিগর, যারা এখন নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
রাজু আহম্মেদ আবেগী কণ্ঠে বলেন, “কেউ স্বেচ্ছায় অশিক্ষিত থাকে না, পরিস্থিতির কারণে কাজ বেছে নিতে হয়। এক ভদ্রলোক আমাকে অশিক্ষিত বলে অপমান করেছিলেন। সেই কষ্ট থেকেই বিচিত্র এই নাম দেয়া। আমার লক্ষ্য, মানুষ যেন এখান থেকে শুধু বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করে না ফিরে, কিছুটা জ্ঞানও সাথে করে নিয়ে যায়।”
কোনো বৈষয়িক প্রত্যাশা নয়, কেবল সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি ও মানুষের ভালোবাসাই রাজুর অনুপ্রেরণা। ডিজিটাল যুগে বই পড়ার হার যখন কমছে, তখন অপমানের জবাবে রাজুর এই প্রগতিশীল উদ্যোগ পুরো এলাকায় প্রশংসিত হচ্ছে। একদিন এই সেলুনটিকে আরও বড় পরিসরে এবং এটির ভেতরেই একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানকেন্দ্রে রূপ দেয়ার স্বপ্ন দেখেন রাজু।
কালের সমাজ/কে.পি

