ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

৪১ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বুড়িচংয়ের তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে

জেলা প্রতিনিধি, কুমিল্লা | অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম ৪১ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বুড়িচংয়ের তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের নিমসার এলাকায় অবস্থিত তাহেরা জুনাব আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার ৪১ বছর পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টিতে উন্নয়নের তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি বলে অভিযোগ শিক্ষক ও অভিভাবকদের। জরাজীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষে পানি চুইয়ে পড়া, শৌচাগারের দুরবস্থা, খেলার মাঠে জলাবদ্ধতা এবং লাইব্রেরি ও ক্যান্টিনের অভাবে দিন দিন কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। একসময় যেখানে শিক্ষার্থী ছিল এক হাজারের বেশি, সেখানে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬০ জনে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মান আরও পিছিয়ে পড়বে।

বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে বিশিষ্ট দানবীর জুনাব আলী নিমসার এলাকায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ওই অঞ্চলে নারী শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একসময় বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি। ভালো ফলাফল ও সুনামের কারণে আশপাশের এলাকার মেয়েরাও এখানে পড়াশোনা করতে আসত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় ধীরে ধীরে বিদ্যালয়টি নানা সংকটে পড়ে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টিতে সরকারি বরাদ্দ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের অনুপযোগী পরিবেশ, শৌচাগারের সংকট, লাইব্রেরি ও ক্যান্টিন না থাকা এবং মাঠে জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পরীক্ষার ফলাফলেও। একসময় শতভাগ পাসের হার থাকলেও বর্তমানে ফলাফল আগের অবস্থানে নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে বিদ্যালয়ের বেহাল চিত্র

সম্প্রতি সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের গ্রিলের গেটটির এক পাশ ভেঙে পড়ে আছে। ভাঙা অংশটি পাশেই ফেলে রাখা হয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠে জমে আছে পানি। পুরোনো দোতলা ভবনের নিচতলার বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা উঠে গেছে। কোথাও কোথাও চুন-সুরকি খসে পড়ছে, আবার কিছু স্থানে দেয়াল স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। ছাদ থেকে পানি চুইয়ে পড়ার চিহ্নও দেখা যায়। কয়েকটি শ্রেণিকক্ষে বৈদ্যুতিক পাখা নেই। পুরো বিদ্যালয়জুড়ে বিরাজ করছে মলিন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

ভবনটির এমন অবস্থা দেখে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

ভবন নিয়ে আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার, মারিয়া ইসলাম শারাপোভা ও জান্নাতুল নূর জানায়, শ্রেণিকক্ষে কখনো ছাদ থেকে পানি চুইয়ে পড়ে, আবার কখনো দেয়াল ও ছাদের চুন-সুরকি খসে পড়ে। ভূমিকম্প হলে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কখন ভবনটি ভেঙে পড়ে, সেই ভয়ও কাজ করে তাদের মধ্যে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শৌচাগারের অবস্থাও ভালো নয়। শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি একটি লাইব্রেরি ও ক্যান্টিন স্থাপনের দাবি জানিয়েছে তারা।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়টি এ মফস্বল এলাকায় একসময় বেশ সুনাম নিয়ে পরিচালিত হতো। কিন্তু নানা সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে। বিদ্যালয়ে আবারও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।’

সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহীন আক্তার বলেন, ‘দানবীর জুনাব আলী বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করলেও দীর্ঘদিনেও এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ভবনটি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বারবার আবেদন করেও কোনো সাড়া পাইনি।’

সংস্কারের উদ্যোগের কথা শিক্ষা কর্মকর্তার

বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘বিদ্যালয়টির সংস্কারের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, শিগগিরই কাজ শুরু করতে পারব। তবে নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়টি সংসদ সদস্য মহোদয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।’

স্থানীয়দের মতে, নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই বিদ্যালয়টির সংকট দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ, পর্যাপ্ত শৌচাগার, লাইব্রেরি, ক্যান্টিন এবং জলাবদ্ধতামুক্ত মাঠ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে আবারও শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরবে—এমন প্রত্যাশা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!