সরকারের প্রস্তুতি আছে বলেই পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ক্রসফায়ার ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। আইজিপির এমন বক্তব্যের জন্য তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারকে ব্যর্থতা ঢাকতে নতুন কোনো নাটক মঞ্চস্থ না করার আহ্বান জানিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন আখতার হোসেন।
আলোচনা সভায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, সংস্কার কার্যক্রম, সাইবার সুরক্ষা আইন, নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন এনসিপির এই নেতা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার এমন পথে এগোচ্ছে, যেখানে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে এবং সরকারের বক্তব্যের বাইরে অন্য কোনো তথ্য প্রচারের সুযোগ রাখতে চাওয়া হচ্ছে না।
সাইবার সুরক্ষা আইনের সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, সরকার সাইবার সুরক্ষার পরিবর্তে নিজেদের সুরক্ষার জন্য আইন করতে চাইছে। সরকারের তথ্যের বাইরে অন্য কোনো তথ্য প্রচার হোক, তা সরকার চায় না। এ ধরনের আচরণ ফ্যাসিবাদী এবং উত্তর কোরিয়া মডেলের মতো।
সরকার অপতথ্য ও গুজব প্রতিরোধের কথা বললেও সরকারের পক্ষ থেকে ছড়ানো বিভিন্ন গুজবের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। সরকারের বক্তব্যকে প্রশ্নাতীতভাবে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতার সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, সরকার যদি বলে তার লম্বা হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ আসতে দেরি হয় কিংবা মিরাজ শেখ গুম হননি, তাহলে কি সেটিকেই সত্য ধরে নিতে হবে?
ময়মনসিংহের ভালুকায় সাথী আক্তারকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার কারণে সাথী আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি সাথী আক্তারের নিঃশর্ত মুক্তি এবং তার বিরুদ্ধে করা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সংস্কার কার্যক্রমের প্রসঙ্গ টেনে আখতার হোসেন বলেন, ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েকবার অভিযোগ করা হয়েছে, সংস্কারের নামে তাদের হাত-পা বেঁধে দেয়া হচ্ছে। সংস্কার কার্যক্রমের শুরুতেই গণভোটের রায় অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে সরকার সেই পথ অনুসরণ করছে।
তিনি বলেন, স্বৈরাচার হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের যেসব জায়গায় হাত-পা বাঁধা ছিল, সেসব বাধা সরকার শুরু থেকেই সরিয়ে নিচ্ছে। গুম কমিশনসহ বিভিন্ন কমিশনকে নিজেদের তল্পিবাহক বানানোর জন্য সরকার আইন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আখতার হোসেন বলেন, বাহিনীগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেই চলে। সরকারের সঙ্গে ক্রসফায়ার নিয়ে ভেতরে ভেতরে কোনো আলোচনা না হলে আইজিপির মুখ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসত না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইজিপির বক্তব্যকে রূপক অর্থে বলা হয়েছে, এমন ব্যাখ্যারও সমালোচনা করেন এনসিপির সদস্যসচিব। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের বক্তব্যকে রূপক অর্থে বলা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হলে সেটি কেমন রূপকথা হয়? আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে আবার কোনো নাটক মঞ্চস্থ করবে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আখতার হোসেন বলেন, আইজিপি ক্রসফায়ারের কথা বলেছেন, এটিকে সরকারের বক্তব্য হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। সরকারের প্রস্তুতি আছে বলেই তিনি এ কথা বলেছেন বলে মনে করেন এনসিপির এই নেতা। এ বক্তব্যের জন্য আইজিপিকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখতে চায়নি। অন্যদিকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইলেও তা নিজেদের দলীয় লোকজন দিয়ে গঠন করতে চায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির অবস্থান মোটেও ইতিবাচক নয়।
বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিএনপি যে পথে এগোচ্ছে, সেটি আরেকটি স্বৈরাচারী পথ। এ ধরনের পরিস্থিতি আর হতে দেয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের প্রতি সাইবার সুরক্ষা আইনসংক্রান্ত সংশোধনী সংসদে উপস্থাপন না করার আহ্বান জানান আখতার হোসেন। তিনি বলেন, এই সংশোধনীতে দেশের মঙ্গলের কোনো কথা নেই। বরং নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব করার উদ্দেশ্যেই আইনটি করা হচ্ছে।
কালের সমাজ/এসআর

