ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার | অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি

পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ, ইনানী ও সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত বিস্তৃত অসংখ্য হোটেল-রিসোর্টের অনেকগুলোতেই নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার নিরাপদ পথও নেই। ফলে আনন্দভ্রমণে এসে পর্যটকদের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে। গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনা পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে। এ ঘটনার পর হোটেল-রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অনুমোদনসংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে পর্যটকদের আবাসনের জন্য গড়ে ওঠা শত শত হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের বিরুদ্ধে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং অনুমোদনহীনভাবে পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অথচ প্রতিবছর এ জেলায় বেড়াতে আসেন প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ পর্যটক গত ১৭ অক্টোবর ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় প্রাণ হারান ১০ জন। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন স্বজন ছিলেন। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পশ্চিম নন্দীপাড়ার বাসিন্দা ওই পরিবারের সদস্যরা অবকাশযাপনে কক্সবাজারে এসেছিলেন। ঘটনার দিনই তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেড়ে নেয় তাঁদের প্রাণ।

রিসোর্টে অবস্থানরত মেহেরুননেসা মিলার (৩০) ঘুম ভাঙে আগুনের তাপে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ায় স্বজনদের খোঁজ নেওয়ারও সুযোগ পাননি তিনি। পরে জানালার কাচ ভেঙে দোতলা থেকে লাফিয়ে স্বামী মাসুদ মিয়াসহ প্রাণে বাঁচেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে থাকা আশিকুল ইসলামও আহত হন। আশিকুল ইসলামের ভাষ্য, রিসোর্টটিতে জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না। জানালার কাচ ভেঙে বাইরে লাফ দিয়ে তাঁরা প্রাণে বাঁচলেও অন্য স্বজনদের হারাতে হয়েছে এই মর্মান্তিক ঘটনা পর্যটকদের আবাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত এক দশকে কক্সবাজার শহরের পাশাপাশি মেরিন ড্রাইভ ও আশপাশের পর্যটন এলাকায় হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা বেড়েছে।

 হোটেল মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকার সাত শতাধিক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের বিরুদ্ধে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা ও কলাতলী এলাকার কয়েকটি তারকা মানের হোটেল-রিসোর্ট এবং মাঝারি ও ছোট আকারের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আহমদ গিয়াসের অভিযোগ, তারকা মানের হোটেলের বাইরে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে পয়ঃশোধনাগারের ব্যবস্থাও নেই। এমনকি দুর্ঘটনার সময় দ্রুত বের হওয়ার জরুরি পথও অনুপস্থিত। 

প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, মাঝারি মানের ৫৩টি হোটেল-রিসোর্ট অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। যাচাই-বাছাই শেষে ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অন্যদের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) সচিব সানজিদা বেগম বলেন, অনেক হোটেলে অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময়ও প্রায়ই এসব অনিয়ম নজরে আসে। 

কউকের তথ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভ সড়কে দোকানপাটসহ প্রায় ২ হাজার ৫০০টি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন জানান, অনুমোদনহীন স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য সম্প্রতি ২৫০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। টুপটুপ রিসোর্টসহ ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানাও করা হয়েছে।

কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার পরিবেশ সুরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাত্র ৪৪টি হোটেল-রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। পয়ঃশোধনাগার বা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট রয়েছে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠানে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা এ তথ্য জানিয়েছেন।

১৯৯৯ সালে কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সরকার। এসব এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরও কঠোর। এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী ২০টির বেশি কক্ষ রয়েছে—এমন রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রয়োজন।

কক্সবাজারে রাতারাতি হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠলেও এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা তদারকিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান চালু করতে কমপক্ষে ১৭ থেকে ১৮টি সরকারি দপ্তরে যেতে হয়। এতে উদ্যোক্তারা নানা ভোগান্তির শিকার হন। এ পরিস্থিতিতে কেউ কেউ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট গড়ে তুলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, রাতারাতি হোটেল-রিসোর্ট গড়ে ওঠার প্রবণতা রয়েছে। জনবলসংকটের কারণে সব অবৈধ স্থাপনা ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে কউক ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে চিহ্নিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ দিকে নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে গত শনিবার জেলা প্রশাসন পর্যটনসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। বৈঠকে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর মালিকেরা অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন অনিয়ম সংশোধনের জন্য ছয় মাস সময় চান।

একই সঙ্গে পর্যটন ব্যবসার অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় সেবা সহজ করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি জানান তাঁরা। স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলও নিরাপদ পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালুর পক্ষে মত দেন।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিটির সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে যেসব অবৈধ হোটেল-রিসোর্টে ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে বেড়াতে আসেন। তাঁদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা হোটেল-রিসোর্ট মালিক, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব। পর্যটকদের নিরাপত্তায় কেবল আশ্বাস ও নোটিশেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি হোটেল-রিসোর্টে কার্যকর অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত কর্মী, জরুরি বহির্গমন পথ এবং নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় পর্যটন নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটবে না।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!