নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে প্রায় তিন মাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পরও সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রত্যাশিত গতি না আসায় পদপ্রত্যাশী ও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
গত ৮ জুলাই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ইবি শাখা ছাত্রদলের ৩৯ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ইংরেজি বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাসুদ রুমি মিথুনকে আহ্বায়ক, পরিসংখ্যান বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের আনোয়ার পারভেজকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাফিজ আহমেদকে সদস্যসচিব করা হয়।
কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় আহ্বায়ক, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের যৌথ স্বাক্ষরে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি এ সময়ে সংগঠনের কার্যক্রম গতিশীল করতে কোনো কর্মীসভা, কর্মী সমাবেশ বা আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের।
আহ্বায়ক কমিটির গঠনতন্ত্রের ১৪(খ) ধারায় বলা হয়েছে, কমিটি গঠনের ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন এবং ৯০ দিনের মধ্যে আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করতে হবে। তবে প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আহ্বায়ক কমিটির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিনিয়র নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছার অভাবে প্রায় তিন মাসেও একটি কর্মীসভা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। বারবার আলোচনা সভা পিছিয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করার পাশাপাশি পদবঞ্চিত কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান কমিটিতে স্থানীয় একজন জাতীয় নেতার ও তাঁর সমর্থকদের সরাসরি প্রভাব বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। এতে বিশেষ করে ঝিনাইদহ জেলার বাইরের নতুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রদলের রাজনীতির প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে, যা সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর।
পদবঞ্চিত নেতা হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এক মাসের মধ্যে গঠনের নির্দেশনা থাকলেও তিন মাসেও তা বাস্তবায়ন না হওয়া হতাশাজনক। সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল ও শক্তিশালী করতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন জরুরি। যোগ্য, ত্যাগী ও সক্রিয় কর্মীদের মূল্যায়নের পাশাপাশি হল, বিভাগ ও অনুষদভিত্তিক কমিটি গঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ কমিটি গঠনের প্রত্যাশা জানান।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার পারভেজ বলেন, কেন্দ্র থেকে অনুমোদিত কমিটিতে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা ছিল। তবে তাঁদের ব্যর্থতা হলো, সমন্বয় করে কেন্দ্রের কাছে কমিটির প্রস্তাবনা দিতে পারেননি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এ ব্যর্থতার দায় নিচ্ছেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি। আমাদের আহ্বায়ক, সদস্যসচিব, কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েক দফায় কেন্দ্রীয় দপ্তরেও কমিটি বাড়ানোর বিষয়ে বলেছি। ক্যাম্পাসেও বিষয়টি বারবার জানিয়েছি। কিন্তু আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের কাছ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা বা কোনো ধরনের আশ্বাস পাইনি।”
তিনি আরও বলেন, সংগঠনের সক্রিয় কর্মীদের অন্তত সাংগঠনিক পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। এতে অন্যরাও সংগঠনের প্রতি উৎসাহিত হবে। দীর্ঘদিন মূল্যায়ন না পেলে কর্মীরা ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। তাঁর মতে, ইতোমধ্যে সংগঠনের কর্মীসংখ্যা কমে আসার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে বিলম্বের বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাফিজ আহমেদ বলেন, খুব শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য কেন্দ্রে সুপারিশ করা হবে। দলের দুঃসময়ে যারা ত্যাগ, শ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। তাড়াহুড়া না করে যোগ্য, পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, অতীত ভূমিকা ও অবদানের ভিত্তিতে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও গতিশীল কমিটি গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য। এ কমিটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ইবি ছাত্রদল আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কাজ চলছে। কমিটিতে যাতে কোনো গুপ্ত ফ্যাসিস্ট বা বিতর্কিত ব্যক্তি স্থান না পান, সে বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে খুব শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১৬ জুন ইবি ছাত্রদলের ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় পর ওই কমিটি বিলুপ্ত করে চলতি বছরের ৮ জুলাই নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটি ঘোষণার পর থেকেই পদ বণ্টন নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। কয়েকজন পদপ্রাপ্ত ও পদবঞ্চিত নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ ও হতাশা প্রকাশ করেন।
কালের সমাজ/কে.পি

