ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে কী ট্রাম্পের?

কালের সমাজ ডেস্ক | অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০১:১৪ পিএম যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে কী ট্রাম্পের?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর পরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ মেয়াদের দুই বছর পর দেশটিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট হয়। এর নাম মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন।

এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে কোনো ভোট হয় না। বরং ভোটাররা কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্যসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেন।

তবে এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল হেরে গেলে কী হয়? প্রেসিডেন্ট কি ক্ষমতা হারান, তাকে কি পদত্যাগ করতে হয়, নাকি নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়?

সহজ উত্তর হলো, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল পরাজিত হলেও প্রেসিডেন্টকে পদ ছাড়তে হয় না। তিনি চার বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন। তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন বলা হয়?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। এই মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছর পর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন।

যেমন, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই হিসাবে ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের নির্বাচন হচ্ছে প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ের ভোট।

এ নির্বাচনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান কংগ্রেসে কোন দল কতটা প্রতিনিধিত্ব পাবে, তা নির্ধারণ করা।

এই নির্বাচনে কাদের নির্বাচন করা হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ রয়েছে—প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও সিনেট। মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই দুই কক্ষের সদস্যদের নির্বাচন করা হয়।

প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫টি নির্বাচিত আসন রয়েছে। সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হওয়ায় প্রতি দুই বছর পরপর সব আসনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

অন্যদিকে সিনেটে মোট ১০০ জন সদস্য রয়েছেন। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তাঁদের মেয়াদ ছয় বছর। তবে একসঙ্গে সব আসনে নির্বাচন হয় না। প্রতি দুই বছর পরপর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়।

এ ছাড়া অনেক অঙ্গরাজ্যে গভর্নর, অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সদস্য এবং স্থানীয় বিভিন্ন পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রেসিডেন্টের দল হারলে কী হয়?
ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল বেশি আসন পেয়ে এক বা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল।

এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট দায়িত্বে থাকবেন ঠিকই, তবে কংগ্রেসে তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। ফলে নতুন আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিরোধী দলের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।

এ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় প্রেসিডেন্টের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হলেও তা সরাসরি ক্ষমতা হারানোর কারণ নয়।

প্রেসিডেন্ট কেন পদে থাকেন?
এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান। দেশটির প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর এবং সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর।

অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও কংগ্রেস নির্বাচন আলাদা প্রক্রিয়া। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা কংগ্রেসের সদস্য পরিবর্তন করতে পারেন, কিন্তু শুধু এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল হেরে যাওয়ায় তাঁর মেয়াদ শেষ হয়ে যায় না।

এ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হলেও প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।

প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কি কমে যায়?
সাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কমে যায় না। তবে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।

এর কয়েকটি কারণ রয়েছে—
- বাজেট: সরকারের ব্যয় ও অর্থ বরাদ্দের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। বিরোধী দলের সঙ্গে মতবিরোধ হলে বাজেট নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
- নতুন আইন: প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন আইন পাস করতে কংগ্রেসের সমর্থন প্রয়োজন।
- নিয়োগ: গুরুত্বপূর্ণ কিছু সরকারি পদে প্রেসিডেন্টের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগে সিনেটের অনুমোদন লাগে।
- তদন্ত: কংগ্রেসে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে।

ফলে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকলেও তাঁর নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারে।

প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কি অভিশংসন হতে পারে?
হ্যাঁ, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার কারণে কোনো প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করা যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণের অভিযোগে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

প্রথমে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের প্রস্তাব অনুমোদিত হতে হয়। এরপর সিনেটে বিচার অনুষ্ঠিত হয়। সিনেটে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পেলে প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণ করা সম্ভব।

অর্থাৎ, কংগ্রেসে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দিতে পারে না। এর জন্য আলাদা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে কি নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়?
না। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে কোনো ভোট অনুষ্ঠিত হয় না। তাই এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়ের কারণে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও হয় না।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় প্রতি চার বছর পরপর। সে অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৮ সালে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রেসিডেন্টের বাকি দুই বছরের শাসন পরিচালনার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। এ নির্বাচনে ভোটাররা অনেকটা মূল্যায়ন করেন, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দল কেমন কাজ করছে।

প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ বাড়ে। অন্যদিকে বিরোধী দল এক বা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রেসিডেন্টকে বিভিন্ন বিষয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে হতে পারে।

তবে নির্বাচনের ফল শুধু প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না। অর্থনীতি, স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা এবং অঙ্গরাজ্যভিত্তিক নানা বিষয়ও এতে ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়; বরং কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের ভোট। এতে প্রেসিডেন্টের দল হারলেও তাঁর চেয়ার বদলায় না, তবে সেই চেয়ার থেকে দেশ পরিচালনার রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যেতে পারে।

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!