ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের আসন হারিয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট। আগের পার্লামেন্টে ৬৮টি আসন থাকলেও এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩টিতে। বিপরীতে বিরোধী শিবির ও আরব দলগুলোর আসন বেড়ে সরকার গঠনের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও নতুন সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন নেতানিয়াহু ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট—দুজনই।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) স্থানীয় সময় ভোরে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি (সিইসি) জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে। গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দেশটির ২৬তম জাতীয় নির্বাচনে ভোট পড়েছে রেকর্ড ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। কয়েক দশকের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। নির্বাচনে মোট ভোট দিয়েছেন ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৫ জন।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষই নিশ্চিত করতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর লিকুদ ২৭, আইজেনকোটের ইয়াশার ২১
চূড়ান্ত ফলাফলে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেয়েছে ২৭টি আসন। বিরোধী শিবিরের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি এবং বি`ইয়াচাদ পেয়েছে ১২টি আসন। এ ছাড়া জয়েন্ট লিস্ট ১১টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস ৮টি এবং রা`আম ৮টি আসন পেয়েছে।
অন্য দলগুলোর মধ্যে ইসরায়েল বেইতেনু, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও ওতজমা ইয়েহুদিত পেয়েছে সাতটি করে আসন। শাস ও রিলিজিয়াস জায়োনিজম পেয়েছে ছয়টি করে আসন।
নির্বাচনে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের বাধা অতিক্রম করতে পারেনি কয়েকটি দল। ইয়োয়াজ হেন্ডেলের রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি পেয়েছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ ভোট। ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরাইল পার্টি পেয়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। আর চারেদি পাবলিক পার্টি পেয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ ভোট।
আরব দলগুলোর রেকর্ড সাফল্য, বাড়ছে রাজনৈতিক গুরুত্ব
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো আরব দলগুলোর আসন বৃদ্ধি। আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা`আম সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। ইসরায়েলের নির্বাচনি ইতিহাসে আরব দলগুলোর এটিই সর্বোচ্চ আসনসংখ্যা। আগের পার্লামেন্টে দল দুটির আসন ছিল মাত্র ১০টি।
ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে এসেছে। তবে জায়োনিস্ট জোটের দলগুলো জয়েন্ট লিস্ট ও রা`আমের সঙ্গে সরকার গঠনে অনাগ্রহী হওয়ায় বিরোধী শিবিরের জন্য এই আসনগুলো কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।
সরকার গঠনে দুই শিবিরেরই ঘোষণা, সামনে কঠিন সমীকরণ
নির্বাচনে পিছিয়ে পড়লেও সরকার গঠনের আশা ছাড়ছেন না নেতানিয়াহু। একইভাবে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটও নতুন সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেছেন। তবে দুই পক্ষের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করা।
চূড়ান্ত ফল আগামী বুধবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার গঠনের বিষয়ে তাদের মতামত ও সুপারিশ শুনবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে তিনি সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন।
আগামী ১০ নভেম্বর নতুন পার্লামেন্ট নেসেটের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। তবে সরকার গঠনের আলোচনা বেশ দীর্ঘ হতে পারে। প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে দুই মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভোট কারচুপির অভিযোগ নাকচ নির্বাচন কমিশনের
এদিকে নির্বাচনে কারচুপি ও কাতারের সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে ভোটে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন।
শুক্রবার ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে কমিশন জানায়, নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডিন লিভনে বলেন, তদন্তের ফল প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এ তদন্ত কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেও পরিচালিত হচ্ছে না।
এর আগে বুধবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আরেকটি নির্বাচন এড়াতে সম্ভাব্য সবকিছু করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘আরেকটি নির্বাচন এড়াতে আমাদের সাধ্যমতো সবকিছু করতে হবে, বিশেষ করে গতকালের ঘটনার পর। তাই আশা করি, এখানে যারা আসছেন, তারা সবাই খোলা মন নিয়ে আসবেন।’
সব মিলিয়ে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোটের আসন কমে যাওয়া, আরব দলগুলোর অভূতপূর্ব সাফল্য এবং বিরোধী শিবিরের শক্ত অবস্থান ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, ১২০ আসনের নেসেটে শেষ পর্যন্ত ৬১ জনের সমর্থন নিয়ে কে সরকার গঠন করতে পারেন।
কালের সমাজ/এসআর

