সাহিত্যচর্চা, প্রবাসী বাঙালির জীবনবোধ ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন নগরকান্দার এই কৃতী সন্তান প্রকৌশল পেশায় যুক্ত থেকেও সাহিত্যচর্চা, গল্প রচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন নিমাই সরকার।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে যুক্ত করেছিল কথাসাহিত্য, শিশু-কিশোর সাহিত্য এবং প্রবাসী বাঙালির জীবনভিত্তিক লেখালেখির সঙ্গে। তাঁর মৃত্যুতে হারিয়ে গেলেন প্রকৌশল ও সাহিত্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব।
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার চাঁদহাট গ্রামের গর্বিত সন্তান নিমাই সরকার ছিলেন চাঁদহাট বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক কৃতী শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী। বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক ও প্রকৌশলী নিমাই সরকার ২৮ অক্টোবর দিবাগত রাত ২টা ১৫ মিনিটে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
তাঁর প্রয়াণে নিজ এলাকা, পরিচিতজন ও সাহিত্যাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তবে তাঁর সাহিত্যকর্ম, সাংস্কৃতিক ভাবনা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।
সাহিত্যের পাতায় জীবনের গল্প
প্রকৌশলবিদ্যার জগতে কর্মজীবন অতিবাহিত করলেও সাহিত্যের প্রতি নিমাই সরকারের অনুরাগ ছিল গভীর। মানুষের অনুভূতি, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক বাস্তবতা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় তাঁর লেখালেখির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। গল্প ও কথাসাহিত্যের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের উপযোগী রচনা এবং বাংলাদেশকে ঘিরে আবেগময় লেখালেখিতেও তিনি রেখেছেন নিজের স্বাক্ষর।
অনলাইন বই বিক্রয় প্রতিষ্ঠান রকমারিতে তাঁর একাধিক গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে, ভালোবাসার কম্পিউটার, আনন্দের কম্পিউটার, দূর্বা বাংলাদেশের শুভেচ্ছা দূত, প্রিয় বাংলাদেশ, প্রাণের বাংলাদেশ, ভালোবাসার পাখি ও আত্মজা।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ দূর্বা বাংলাদেশের শুভেচ্ছা দূত ২০১৬ সালে সমগ্র প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। শিশু-কিশোর সাহিত্য হিসেবে তালিকাভুক্ত এই বই তাঁর লেখকসত্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে।
তাঁর লেখায় ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি ও সম্পর্কের পাশাপাশি সমাজজীবনের নানা অভিজ্ঞতা স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসজীবন, জন্মভূমির প্রতি টান, পরিবারের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা তাঁর সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
“মনবাড়ি” গল্পে জন্মভূমি ও শিকড়ের টান
নিমাই সরকারের মনবাড়ি গল্পে প্রবাসজীবনের সঙ্গে জন্মভূমি ও পরিবারের আবেগময় সম্পর্কের চিত্র ফুটে উঠেছে। গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সুমনের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ পরিবেশ, পারিবারিক মমত্ববোধ এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ পেয়েছে।
মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে দেশ ছাড়তে পারে, গড়ে তুলতে পারে নতুন ঠিকানা; কিন্তু শৈশবের স্মৃতি, আপনজন আর জন্মভূমির প্রতি মনের টান সহজে মুছে যায় না। প্রবাসে থেকেও শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা তাঁর গল্পে আবেগের সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে।
জীবনের পরিচিত অনুভূতিগুলোকে সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি পাঠকের সামনে এমন এক মানবিক বাস্তবতা হাজির করেছেন, যা দেশ-কাল ও ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে।
প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন
নিমাই সরকারের লেখালেখির আরেকটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন ও সংস্কৃতি। প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় আয়োজন, সাহিত্যসভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নানা অনুষঙ্গ তাঁর লেখায় স্থান পেয়েছে।
তাঁর লেখায় প্রবাসী বাঙালির পারস্পরিক সম্প্রীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং মাতৃভাষার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে। ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষের জীবনকে আলাদা করলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও শিকড়ের বন্ধন যে অটুট থাকতে পারে, তাঁর লেখায় সেই সত্যেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও রেখে গেছেন অবদানের স্মারক
সাহিত্যচর্চা ও পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন নিমাই সরকার।
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার কমলাপুরের আব্দুল খালেক একাডেমিতে তাঁর অনুদানে নির্মিত হয়েছে “উপেন্দ্র বিজ্ঞান ভবন”।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর এই সম্পৃক্ততা স্থানীয় শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার সুযোগ সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। তাঁর এই অবদান প্রমাণ করে, পেশাগত জীবন ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি শিক্ষার প্রসারেও তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভূমিকা রেখেছেন।
নিমাই সরকারকে শুধু একজন প্রকৌশলী কিংবা সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করলে তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়ের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। প্রকৌশল পেশা, সাহিত্যচর্চা, শিশু-কিশোরদের জন্য লেখালেখি, প্রবাসী বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতিকে ধারণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবদান, তাঁর জীবন ও কর্মের পরিসর ছিল বিস্তৃত।
তাঁর সাহিত্যকর্মের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর নিবিড় পাঠ, সাহিত্যসমালোচনা এবং পাঠক-প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা জরুরি। তবে প্রকাশিত বই ও সংবাদমাধ্যমে তাঁর লেখালেখি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের পরিচয় বহন করে।
মানুষের জীবন থেকে একসময় বিদায় নিতে হয় সবাইকে। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, সৃষ্টিশীলতা ও অবদানের মধ্য দিয়ে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন দীর্ঘকাল। নিমাই সরকারও তেমন একজন। যাঁর জীবন প্রকৌশল ও সাহিত্যের মধ্যে গড়ে তুলেছিল এক অনন্য সেতুবন্ধন।
নগরকান্দার চাঁদহাট গ্রামের এই কৃতী সন্তান তাঁর সাহিত্যকর্ম, জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের মধ্য দিয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর প্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়; তবে তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও অবদানের চর্চা তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলার পথ উন্মুক্ত রাখবে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলোর নাগরিক সংবাদ, রকমারিতে প্রকাশিত লেখক ও গ্রন্থতালিকা এবং সংশ্লিষ্ট গ্রন্থের প্রকাশনা-তথ্য।
কালের সমাজ/কে.পি

