যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসে দেয়া তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্প বলেছেন, বিশ্বের ‘সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক’ দেশকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেয়া হবে না।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে দেয়া এই ভাষণকে ওয়াশিংটনের কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সামরিক শক্তি প্রস্তুত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ইতিমধ্যেই তিন শতাধিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ভাষণের প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ইরান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প অভিযোগ করে বলেন, তেহরান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করেছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি অঞ্চল ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান আবারো পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদার করছে এবং এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি তিনি ইরানকে সড়কবোমা হামলার মাধ্যমে মার্কিন সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার জন্য দায়ী করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, তারা একটি চুক্তি করতে চায়, কিন্তু আমরা সেই গোপন কথাটি শুনিনি- ‘আমরা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবো না।’
তার অভিযোগ, ইরান প্রকাশ্যে আলোচনা করলেও এখনো পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার দেয়নি।
গত বছর ইরানের ওপর হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাতে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সমপ্রতি সতর্ক করেছেন, ইরান দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক জ্বালানি উৎপাদনের জন্য।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্পের বক্তব্যকে মিথ্যার পুনরাবৃত্তি বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামপ্রতিক বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়ে যে দাবি করা হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
ভাষণের আগে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। একই সময়ে সিনেটের ডেমোক্রেটিক নেতা চাক শুমার সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে হলে তা গোপনে নয়, বরং জনসম্মুখে আলোচনা করে নেয়া উচিত।
তার ভাষায়, গোপন সামরিক অভিযান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, বাড়তি ব্যয় ও কৌশলগত ভুলের ঝুঁকি তৈরি করে। ট্রাম্প তার রাজনৈতিক উত্থানে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কথা তুলে ধরে দীর্ঘ ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ বা অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধের অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে সামপ্রতিক পরিস্থিতিতে ইরান ইস্যুতে তার অবস্থান নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক সরাসরি ও তাৎক্ষণিক হুমকি না থাকলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিপক্ষে।
ভাষণের বড় অংশ জুড়ে ট্রাম্প অর্থনীতি, অভিবাসন ও অভ্যন্তরীণ নীতির সাফল্য তুলে ধরলেও ইরান প্রসঙ্গে তার বার্তা ছিল স্পষ্ট ও কঠোর। তিনি বলেন, আমি যেখানে সম্ভব শান্তি প্রতিষ্ঠা করবো, কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে হুমকি এলে মোকাবিলায় কখনো দ্বিধা করবো না। তার এই বক্তব্যে কূটনৈতিক সমাধান ও সামরিক প্রস্তুতি- দুই পথই খোলা রাখার ইঙ্গিত মিলেছে।রাজনৈতিক বই
মধ্যপ্রাচ্যে ৩ শতাধিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন: সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পরমাণু চুক্তি নিয়ে আজ তৃতীয় দফার আলোচনায় বসছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। যা নজিরবিহীন। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাধীন অঞ্চলে তিন শতাধিক মার্কিন সামরিক বিমান মোতায়েন রয়েছে।
বুধবার বার্তা সংস্থা আনাদোলু এক প্রতিবেদনে জানায়, এসব বিমান মূলত কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি, জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করছে। পাশাপাশি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বিমানবাহী রণতরীতে থাকা ক্যারিয়ারেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোতায়েনকৃত বিমানবহরে রয়েছে আক্রমণাত্মক ও সহায়ক উভয় ধরনের যুদ্ধবিমান। তবে, ৭০ শতাংশই যুদ্ধবিমান।
বাকি ৩০ শতাংশ বিশেষায়িত ভূমিকার বিমানের মধ্যে রয়েছে- ১৮টি ইএ-১৮জি গ্রাউলার ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বিমান, ১২টি এ-১০সি থান্ডারবোল্ট ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট বিমান, ৫টি ই-১১এ ব্যাটলফিল্ড এয়ারবর্ন কমিউনিকেশন নোড (বিএসিএন) এবং ৬টি ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াকস)।
কালের সমাজ/এসআর


আপনার মতামত লিখুন :