দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে সংস্কারের ছোঁয়া লাগছে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং রাষ্ট্রনায়ক বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের স্মৃতিতে সমৃদ্ধ এই শতবর্ষী স্থাপনাটি নতুনভাবে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পুরোনো সার্কিট হাউস ভবনটি কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নীরব সাক্ষী। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯১৩ সালে নির্মিত ভবনটি একসময় ‘লাল সাহেবের কুঠি’ নামে পরিচিত ছিল। পরে পাকিস্তান আমলে এটি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ভবনটিকে নির্যাতনকেন্দ্রে পরিণত করেছিল। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালির ওপর এখানে চালানো হয়েছিল অমানবিক নির্যাতন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বগাঁথা ভূমিকার জন্য বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অনন্য স্থান করে নেন। জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখসমরে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, যে চট্টগ্রাম ছিল তাঁর বীরত্বের স্মৃতিবাহী শহর, সেই চট্টগ্রামেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হামলায় নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেই ঘটনার স্মৃতি ধারণ করেই পরবর্তীতে সার্কিট হাউস ভবনটিকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়।

১৯৮১ সালের ৩ জুন সরকার ভবনটিকে জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি-সংগ্রহশালা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
বর্তমানে জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত রয়েছে ৯০২টি মূল্যবান স্মারক। ১২টি গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের জীবন, কর্ম ও রাষ্ট্র পরিচালনার নানা অধ্যায়। দর্শনার্থীরা এখানে দেখতে পান তাঁর ব্যবহৃত পোশাক, ব্যাগ, টুপি, ব্যক্তিগত সামগ্রী, বিরল আলোকচিত্র এবং রাষ্ট্রপতি থাকাকালে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের দেওয়া উপহার।
এছাড়া রয়েছে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার ত্রিমাত্রিক রেপ্লিকা, মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠ ও সেক্টর কমান্ডারদের ছবি, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র এবং ঐতিহাসিক কালুরঘাট যুদ্ধের আলোকচিত্র। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে সংরক্ষিত আছে সেই কক্ষের খাট, টেবিল ও কার্পেট, যেখানে জীবনের শেষ রাতটি কাটিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
তবে দীর্ঘদিন সংস্কারহীন অবস্থায় থাকায় জাদুঘরের ভবনটি ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। গত বছরের ভূমিকম্পে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার স্বার্থে তখন জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
অবশেষে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত সংস্কার কাজ। জানা গেছে, তিন ধাপে সম্পন্ন হবে পুরো প্রকল্প। প্রথম ধাপে ভবনের কাঠামোগত মেরামত, দ্বিতীয় ধাপে সংরক্ষণ এবং তৃতীয় ধাপে পুনরুদ্ধার ও আধুনিক প্রদর্শন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশা, সংস্কার শেষে জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় রূপে দর্শনার্থীদের সামনে উন্মুক্ত হবে। এতে শুধু জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচিহ্নই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও আরও সুশৃঙ্খল ও আধুনিক উপায়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
ইতিহাসবিদ ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহনকারী এই জাদুঘর সংরক্ষণ করা জাতীয় দায়িত্ব। কারণ এটি কেবল একজন রাষ্ট্রপতির স্মৃতির ধারক নয়, বরং বাংলাদেশের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
দুই দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে যখন নতুন রূপে ফিরতে চলেছে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, তখন ইতিহাসপ্রেমী মানুষ ও বীর উত্তম জিয়ার অনুসারীদের প্রত্যাশা—এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের গৌরবময় অতীতকে জানার এক আধুনিক ও সমৃদ্ধ কেন্দ্র।
কালের সমাজ/এএইচবি

