জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২।
মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। মামলার একমাত্র আসামি ছিলেন হাসানুল হক ইনু। এই রায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এর মাধ্যমে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় দায়ের হওয়া ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো।
রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করেন।
৩০ নভেম্বর সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে মামলার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং ১ ডিসেম্বর প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষ তাদের পক্ষে দুইজন সাফাই সাক্ষী হাজির করে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ১৩ মে শেষ হয়। পরবর্তীতে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল এবং ২২ জুন ট্রাইব্যুনাল ৩০ জুন রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
মামলায় হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ, দমন-পীড়ন ও হত্যার জন্য উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা প্রদান করেন।
দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ১৪-দলীয় জোটের বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্তে তিনি নির্দেশনা, উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা দেন বলে অভিযোগ আনা হয়।
তৃতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ছবি দেখে তালিকা প্রস্তুত করা এবং তাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোনে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোমা হামলার পরিকল্পনায় তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।
পঞ্চম অভিযোগে গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সরকারের দমন-পীড়ন, হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতনকে সমর্থন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়, ১৪-দলীয় জোটের বৈঠকে উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি অংশ নেন। সপ্তম অভিযোগে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে একটি ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
সবচেয়ে গুরুতর অষ্টম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী এবং আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন নামে ছয়জন আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ দেন ইনু। একই সঙ্গে সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই মামলার রায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিচারিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে উল্লেখ্য, আদালতের রায়ে দণ্ডিত হলেও একজন আসামির আইনগত অধিকার অনুযায়ী উচ্চতর আদালতে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।
কালের সমাজ/এএইচবি

