মোংলা পৌর শহরের সাত্তার লেনের ওই বাড়িটিতে শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষজন কেউ নিথর দেহগুলোর পাশে বসে বিলাপ করছেন, কেউ নির্বাক দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন। কান্নার শব্দে পুরো এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে এক ভারী শোকের আবহ।
সেই উঠানেই রাখা হয়েছে পৌর বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক, তার ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের মরদেহ। স্বজনদের আর্তনাদে মুহূর্তে মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ। স্থানীয়দের ভাষ্য—মোংলার ইতিহাসে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি।পরিবারের স্বজনরা জানান, আনন্দঘন পরিবেশে বিয়ের আয়োজন শেষ করে নববধূকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মুহূর্তেই আনন্দের সেই যাত্রা রূপ নেয় শোকের মিছিলে।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে খুলনা ও বাগেরহাটের রামপাল থেকে নিহতদের মরদেহ এনে রাখা হয় মোংলার সাত্তার লেনের ওই বাড়িতে। এরপর থেকেই বাড়িটির উঠান যেন পরিণত হয় এক শোকের সমুদ্রে।
অন্যদিকে নিহত নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতু, তার বোন লামিয়া আক্তার, দাদী রাশিদা বেগম ও নানী আনোয়ারা বেগমের মরদেহ রাতেই নেওয়া হয় খুলনার কয়রায়। আর মাইক্রোবাস চালক নাঈম শেখের মরদেহ পৌঁছেছে বাগেরহাটের রামপালের সিঙ্গেরবুনিয়ায়।
এদিকে স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ পরিবারের ৯ জনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন আশরাফুল রহমান জনি। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। ছোট ভাই সাব্বিরের বিয়েতে তিনি পরিবারের সঙ্গে কয়রায় গিয়েছিলেন। পরিবারের সবাই মাইক্রোবাসে উঠলেও তিনি পিছনে মোটরসাইকেলে আসছিলেন। সেই কারণে প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু তার চোখের সামনে গাড়ি থেকে বের করা হয় স্ত্রী ফারজানা সিদ্দিকা পুতুল, ছেলে আলিফ, ইরাম ও রায়হানা রহমানসহ প্রিয়জনদের নিথর মরদেহ।
এতো আপনজনকে হারিয়ে তিনি এখন প্রায় বাকরুদ্ধ। পরিবারের মৃত্যুর খবর পেয়ে অসাড় হয়ে রয়েছেন মা আঞ্জুমানয়ারা। আর বেঁচে থাকা আরেক ভাই সাদ্দাম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দুপুর ২টায় মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং হাজারো মানুষ সেখানে অংশ নেন। জানাজা শেষে মোংলা পৌর কবরস্থানে একে একে তাদের দাফন করা হয়।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক আব্দুল বাতেন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাসান, রামপাল-মোংলা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ রেফাতুল ইসলাম, মোংলা থানার ওসি শাহীনুর রহমান শাহীন, পৌর বিএনপির সভাপতি জুলফিকার আলী, সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদারসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ড. ফরিদুল ইসলাম শোক প্রকাশ করে বলেন, একটি পরিবারের এতগুলো প্রাণ একসঙ্গে ঝরে যাওয়া সত্যিই অত্যন্ত মর্মান্তিক।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাগেরহাট জেলা শাখার নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াদুদ, বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মনজুরুল হক রাহাত এবং মোংলা উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক কোহিনুর সরদার।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি পরিবারের আনন্দমুখর বিয়ের আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে গভীর শোকে। চোখের সামনে সারি সারি লাশ আর চারদিকে স্বজনদের বুকফাটা কান্না—এই দৃশ্য যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, এক মুহূর্তের দুর্ঘটনায় কিভাবে একটি পরিবার প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
মোংলার মানুষের ভাষায় এক উঠানে ৯টি লাশ আর চারদিকে কান্না—আজ যেন পুরো জনপদটাই পরিণত হয়েছে এক বিশাল শোকের ঘরে।

