বিকেলের নীল আকাশ যেন হঠাৎ করেই রঙতুলির আঁচড়ে বদলে গেল এক বিশাল ক্যানভাসে। সাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে বেড়াচ্ছে নানান রঙের স্বপ্ন।
কোথাও ড্রাগন, কোথাও ঈগল, কোথাও আবার দীর্ঘ লেজওয়ালা রঙিন ঘুড়ির নৃত্য। দূর থেকে মনে হয়, আকাশের বুকে যেন গল্পের রাজ্যের অসংখ্য চরিত্র একসঙ্গে ডানা মেলেছে। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী ইউনিয়নের দাতিয়াদাহ গ্রামের মাঠে গত ২৫ মে এমনই এক বর্ণিল বিকেলের জন্ম দিয়েছিল স্থানীয় যুবসমাজের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব’।
বর্তমান সময়ের শিশুরা যখন ক্রমেই মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল পর্দার জগতে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, তখন এই আয়োজন যেন ফিরিয়ে আনল গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক চিরচেনা আনন্দকে। খোলা মাঠ, মুক্ত বাতাস আর আকাশভরা ঘুড়ির রঙে নতুন প্রাণ ফিরে পেল এলাকার মানুষ।
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দাতিয়াদাহ পূর্বপাড়া গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠে ভিড় বাড়তে থাকে। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ঘুড়িপ্রেমীরা তাঁদের নিজস্ব নকশার ঘুড়ি নিয়ে হাজির হন। কারও হাতে চিল, কারও হাতে ড্রাগন, কারও হাতে মাছ কিংবা ঢোল আকৃতির অভিনব ঘুড়ি। বিকেল চারটায় আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব শুরু হলে মুহূর্তেই আকাশ ভরে ওঠে অর্ধশতাধিক রঙিন ঘুড়িতে।
একেকটি ঘুড়ি আকাশে উঠার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের উচ্ছ্বাসও বাড়তে থাকে। কার ঘুড়ি সবচেয়ে উঁচুতে উঠবে, কার সুতোর নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে নিখুঁত হবে, তা নিয়ে চলে প্রাণবন্ত প্রতিযোগিতা। মাঠজুড়ে উপস্থিত শত শত দর্শক মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন সেই দৃশ্য। শিশুদের হাসি, তরুণদের উচ্ছ্বাস আর প্রবীণদের স্মৃতিচারণ মিলিয়ে উৎসবটি হয়ে ওঠে এক অনন্য সামাজিক মিলনমেলা।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল বয়সের সীমা ভেঙে সবার অংশগ্রহণ। শুধু শিশু-কিশোর নয়, অনেক প্রবীণও হাতে তুলে নিয়েছিলেন নাটাই। দীর্ঘদিন পর ঘুড়ির সুতোয় টান দিতে দিতে তাঁরা ফিরে গিয়েছিলেন নিজেদের শৈশবে। যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য সময়ের চাকা ঘুরে গেছে বহু বছর পেছনে।
গ্রামীণ সমাজ ও সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, ঘুড়ি ওড়ানো কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ কিংবা শরৎকালের বিকেল মানেই ছিল মাঠজুড়ে ঘুড়ির উৎসব। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা ও নগরায়ণের প্রভাবে সেই সংস্কৃতি ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন বাস্তবতায় দাতিয়াদাহ গ্রামের এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের সামনে ঐতিহ্যকে পুনরায় তুলে ধরার একটি ইতিবাচক প্রয়াস।
উৎসবের আয়োজক ও ঘুড়ি উৎসব কমিটির সভাপতি মো. হুমায়ন মোল্যা বলেন, “অনেক বছর ধরে কর্মব্যস্ততার কারণে গ্রামের বাইরে থাকি। কিন্তু স্থানীয় তরুণরা যখন এই আয়োজনের কথা জানাল, তখন আমি খুবই আনন্দিত হই। আজ কয়েকটি গ্রামের মানুষ এখানে একত্রিত হয়েছেন। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও উচ্ছ্বাস আমাদের আরও অনুপ্রাণিত করেছে। আগামীতে আরও বড় পরিসরে এই উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।”
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে ঘুড়িগুলোও নেমে আসে মাটিতে। কিন্তু আকাশ থেকে নেমে গেলেও সেগুলো রয়ে যায় মানুষের স্মৃতিতে। এক বিকেলের এই রঙিন উৎসব যেন সবাইকে মনে করিয়ে দিল, আধুনিকতার স্রোতের মধ্যেও গ্রামীণ ঐতিহ্য এখনো বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে। শুধু প্রয়োজন কিছু আন্তরিক উদ্যোগ, আর শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা।
কালের সমাজ/কে.পি

