ঢাকা সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ইতিহাসের বরপুত্র ও বঙ্গবন্ধু উপাধির ঘোষক: এক বর্নাঢ্য রাজনৈতিক নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ

মোহাম্মদ আলী সুমন | জুন ১, ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম ইতিহাসের বরপুত্র ও বঙ্গবন্ধু উপাধির ঘোষক: এক বর্নাঢ্য রাজনৈতিক নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশের দেদীপ্যমান এক নক্ষত্র নিভে গেল। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মহান সংগঠক, সাবেক সফল মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান অভিভাবক তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

১ জুন, সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগে অবশেষে তিনি পাড়ি জমালেন না-ফেরার দেশে। তার এই প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। গত বছরের ২০ নভেম্বর তার সহধর্মিণী আনোয়ারা আহমেদও মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি একমাত্র কন্যা চিকিৎসক তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী ও জামাতা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুজ্জামান তুহিনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শোকাকুল রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক রেখে গেছেন।

তোফায়েল আহমেদের জীবন মানেই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। বাবা মৌলভী আজহার আলী ও মা ফাতেমা বেগমের যোগ্য সন্তান তোফায়েল আহমেদ ভোলা সরকারি হাই স্কুল ও বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের পাঠ চুকিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়েও তার জীবনের বড় বিদ্যাপীঠ ছিল রাজপথ।

ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের উত্থান ছিল রূপকথার মতো। ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের ভিপি এবং পরবর্তীতে ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে ডাকসুর ভিপি হিসেবে তিনি বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি ছিলেন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক। তার তেজস্বী ও আপসহীন নেতৃত্বে তৎকালীন আইয়ুব খানের সামরিক জান্তা কেঁপে উঠেছিল, যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

ইতিহাসের পাতায় তোফায়েল আহমেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে একটি বিশেষ ঘটনার জন্য। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তোফায়েল আহমেদই বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সের এক যুবকের বজ্রকণ্ঠের সেই ঘোষণা আজ বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ-প্রতিটি বাঁকে তোফায়েল আহমেদ রেখেছেন অসামান্য কীর্তি। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও অকুতোভয় ‍‍`মুজিব বাহিনী‍‍`র (বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম একজন।

দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তৎকালীন সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আদর্শের পথে অবিচল ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সালের পর টানা ৩৩ মাসসহ জীবনের দীর্ঘ সময় তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে, কিন্তু আদর্শ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি এক চুলও।

সংসদীয় রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ তৈরি করেছেন এক অনন্য ও দুর্ভেদ্য রেকর্ড। তিনি ভোলা ও ময়মনসিংহ আসন থেকে মোট নয়বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দলের ক্রান্তিলগ্নে শক্ত হাল ধরেছেন তিনি।

শুধু রাজপথের লড়াকু সৈনিকই নন, রাষ্ট্র পরিচালনায় ও দেশের অর্থনীতি সচল রাখতেও তিনি আধুনিক ও দূরদর্শী দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের সরকারে তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারকরণে তার অবদান চিরস্মরণীয়।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির প্রয়াণ নয়, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাসের অবসান। রাজপথের তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির নীতি নির্ধারক এবং প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি যে কীর্তি রেখে গেছেন, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের নাম চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে। আমরা এই মহান নেতার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। ইতিহাসের এই মহানায়ক বেঁচে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে, অনন্তকাল।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!