ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩

জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই শ্রীপুরে ৯৩ কোটি টাকার বাজেট

জেলা প্রতিনিধি,গাজীপুর | জুন ২৪, ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই শ্রীপুরে ৯৩ কোটি টাকার বাজেট

গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯২ কোটি ৯৭ লাখ ৫৯ হাজার ১৭৩ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিপুল অঙ্কের এই বাজেট ঘিরে পৌর এলাকাজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বা নাগরিকদের কোনো প্রকার অংশগ্রহণ ছাড়াই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বাজেট ঘোষণা করায় স্থানীয় সচেতন মহল ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ একে ‘দায়সারা’ ও ‘স্বচ্ছতাহীন’ প্রক্রিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
‎মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুপুরে পৌরসভা কার্যালয়ের সভাকক্ষে পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাহিদ ভূঞা এই বাজেট ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ৯৮ হাজার ৯১৭ টাকার সংশোধিত বাজেটও অনুমোদন দেওয়া হয়। এবারের বাজেটে নতুন কোনো কর আরোপ না করা হলেও, বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার ‘একপেশে’ আচরণ নিয়ে চারদিকে প্রশ্ন উঠেছে।

‎আইন অনুযায়ী বাজেট ঘোষণার আগে উন্মুক্ত আলোচনা ও নাগরিক মতবিনিময়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, এ ক্ষেত্রে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। মাত্র ৩০ মিনিটের এই আয়োজনে কোনো নাগরিক, পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
‎বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শ্রীপুর পৌর সচেতন নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন,সাধারণ মানুষকে দূরে রেখে এভাবে বাজেট প্রণয়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি নাগরিকদের অধিকারের পরিপন্থী।

‎বাজেট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মেয়র প্রার্থীরাও। শ্রীপুর পৌর বিএনপির সদস্য সচিব ও মেয়র প্রার্থী বিল্লাল হোসেন বেপারী বলেন, আমাদের জানার অধিকার আছে। সবাইকে নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হতো। এছাড়া গাজীপুর জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক ও মেয়র প্রার্থী এস এম আবুল কালাম আজাদ, ডাঃ. সফিকুল ইসলাম এবং ড. মুহাম্মদ হারুনুর রশীদ বিষয়টিকে প্রশাসনের ‘সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

‎বাজেট অনুষ্ঠানে সাধারণ নাগরিকদের অনুপস্থিতি ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে পৌর প্রশাসক ও ইউএনও মো. নাহিদ ভূঞা বলেন, বর্তমানে আমাদের কোনো জনপ্রতিনিধি নেই। এখানে লুকোচুরির কিছু নেই, থাকলে আপনাদের দাওয়াত দিতাম না। তবে প্রশাসকের এই বক্তব্যে স্থানীয়রা সন্তুষ্ট নন।

‎এদিকে, বাজেট ঘোষণার অনুষ্ঠানেই আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিগত বছরের আনুষাঙ্গিক খরচের ১২ লাখ টাকার উৎস বা ব্যাখ্যা জানতে চাইলে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস হাওলাদার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরবর্তীতে পৌর প্রশাসক প্রতিটি খরচ যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করার নির্দেশনা দিলেও, বাজেট ঘোষণার শুরুতেই এমন অস্পষ্টতা জনমনে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি করেছে।

‎বাজেট অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের উপস্থিতি ও খাবারের বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন যে, তাদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। এ বিষয়ে পৌর সচিব মো. বদরুজ্জামান জানান, আমরা সব প্রেসক্লাবের সভাপতিকে জানিয়েছি।
‎ সাংবাদিকদের জন্য বিরিয়ানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কিন্তু সাংবাদিক কম উপস্থিত হওয়ায় খাবার বেশি থেকে যায়, যা পরে অন্যদের ডেকে এনে দেওয়া হয়েছে।

‎শ্রীপুরের সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যদি শুরুতেই সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রাখা হয়, তবে এই বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাবে—তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। জনঅংশগ্রহণহীন এই বাজেট আদৌ পৌরসভার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!