নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীর তলদেশ ও রক্ষা বাঁধের পাড় থেকে অবৈধভাবে বালু-মাটি কাটার অভিযোগ উঠেছে।
এতে হুমকিতে পড়েছে নদী, রক্ষা বাঁধ ও নদীপাড়ে থাকা বসতবাড়ি ও ফসলী জমি। খোদ ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে চলছে এই বালু-মাটি উত্তোলনের মহোৎসব। বর্ষার আগে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু-মাটি উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙন ও নদীপাড়ের ফসলী জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা স্থানীয়দের।
জানা যায়, সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের দিয়াড় ধাইনগর মহানন্দা নদীর ঘাট থেকে এসব বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। নদী থেকে এসব বালু-মাটি উত্তোলন করে সরকারি প্রকল্পের একটি রাস্তায় ভরাট দিয়ে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। নদীকেই নিজের বাপ-দাদার সম্পত্ত বলে দাবি করে বালু-মাটি কাটার অভিযোগ স্বীকার করেছেন, গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি রবিউল ইসলাম টিপু।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতক্ষ্যদর্শী সূত্রে জানা যায়, দিয়াড় ধাইনগর বালুগ্রামের শেষ মাথায় সিরাজুলের বাড়ি থেকে ইউসুফের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করছে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাবিখা প্রকল্পের আওতায় সড়কটি নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া হয় ৬ মেট্রিক টন চাল। অভিযোগ উঠেছে সড়ক নির্মাণের ভরাট বাইরে না কিনে সেই অর্থ হাতিয়ে নিতেই নদীর বালু-মাটি অবৈধভাবে কেটে এনে সড়কে দিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপু।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দিয়াড় ধাইনগর এলাকায় কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষক বলেন, প্রত্যেক বছর নদী কেটে নিয়ে যায় চেয়ারম্যান। গতবছর মহানন্দা নদীর ঘাটের উত্তরদিকে বালু-মাটি কেটেছে। এবছর একইভাবে নদীর পাড় ঘেঁষে নদী রক্ষা বাঁধের কাছাকাছি এলাকায় দক্ষিণ দিকে বালু-মাটি উত্তোলন করেছে। এভাবে বারবার বালু-মাটি উত্তোলন করায় নদীর পাড়ে বিভিন্ন জায়গায় গর্ত তৈরি হয়েছে। ফলে শুষ্ক সময়ে এসব জমিতে ধান চাষাবাদ করাও যাবে না। এমনকি বর্ষা আসলেই এসব বালু-মাটি উত্তোলনের কারনে বাঁধ ও আশেপাশের এলাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম জানান, নদী থেকে এসব বালু-মাটি নিয়ে গিয়ে উপজেলা থেকে তৈরি হওয়া রাস্তার ভরাট দেয়া হচ্ছে। অথচ মাটি ভরাটের জন্য সরকার বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু তা নিজের পকেটে রেখে নদীর বালু-মাটি কেটে ক্ষতি করছে চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপু। ক্ষমতার দাপটে প্রকাশ্যে নদীর বালু-মাটি কেটে নিলেও প্রশাাসনের কোন ভূমিকা নেই। নদীর আশপাশের হাজার হাজার বিঘা ফসলী জমি ও বসতবাড়ি হুমকিতে পড়বে এমনভাবে নদী থেকে গর্ত করে মাটি কাটার কারনে।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, সরকার নদীর পাশের একটি নতুন সড়কের নির্মাণকাজ করছে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সরকার তো নতুন সড়কের ভরাটের জন্য প্রকল্পের সভাপতিকে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। সেই অর্থ হাতিয়ে নিতেই বালু-মাটি না কিনে নদী থেকে তুলে এনে ভরাট করছে চেয়ারম্যান। একটি কাজ করতে গিয়ে আরেকটি সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন করছেন তিনি। এনিয়ে কঠোর হওয়া উচিত প্রশাসনের।
নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন গোবরাতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপু। মুঠোফোনে তিনি বলেন, সরকারি কাজে এসব বালু-মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া নদীর ওই জায়গাটি আমার বাপ-দাদার পৈত্রিক সম্পত্তি। প্রকল্পের বরাদ্দ কত এবং সেই অর্থ ব্যয় না করতেই নদীর বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম টিপু।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. শাহিনুর আলম বলেন, প্রকল্পের সভাপতিকে কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৬ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরেজমিনে নির্মাণাধীন সড়কটি আমি পরিদর্শন করেছি। তবে ভরাটের বালু-মাটি কোথা থেকে আনা হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। যদি নদী থেকে আনা হয়, তা অবশ্যই আইন বর্হিভূত কাজ। ভবিষ্যতে যাতে এমন কাজ না করা হয়, বিষয়টি ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব জানান, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। খোঁজ-খবর নিয়ে নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলন করলে এর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নদী বা বাঁধের পাড় ঘেঁষে অপরিকল্পিতভাবে বালু-মাটি উত্তোলন করলে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ও নদীপাড়ের ফসলী জমি ও বসতবাড়ি মারাত্মক হুমকিতে পড়বে বলেও জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন মুঠোফোনে বলেন, নদী থেকে বালু-মাটি উত্তোলন করে সড়কের ভরাট দেয়ার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। খোঁজ-খবর নিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কালের সমাজ/কে.পি

