বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব কয়েকশ গজ। অথচ সেই পথ পাড়ি দিতে হলে কোমলমতি শিশুদের সামনে পড়ে প্রায় ৩২ ফুট গভীর একটি নদী। নদীর বুক চিরে ওপারে যেতে হয় ছোট ডিঙি নৌকায়। বর্ষায় পানি ও স্রোত বাড়লে সেই নৌযাত্রা হয়ে ওঠে ভয়ংকর। এরই মধ্যে পারাপারের একমাত্র নৌকাটিও ভেঙে গেছে। ফলে প্রায় পাঁচ মাস ধরে বিদ্যালয়ে নিয়মিত যেতে পারছে না নদীর ওপারের ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী। তবে কেউ কেউ কলাগাছের ভেলা বানিয়ে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ আবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁতার কেটে স্কুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার কম্পো নদীর কোলঘেঁষে নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদীর এক পাড়ে বিদ্যালয়, অন্য পাড়ে মালিদহ ও গোপাইল গ্রামের মানুষের বসতি। মাঝখানে গভীর নদী। নিরাপদ সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে এই নদীই হয়ে আছে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের চলাচলের সবচেয়ে বড় বাধা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৫ সালে। প্রায় ১২১ বছর ধরে বিদ্যালয়টি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে গেলেও এর শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য নদীর ওপর কোনো স্থায়ী সেতু নির্মাণ হয়নি। ফলে বিদ্যালয়ের বয়স বাড়লেও কমেনি নদী পারাপারের ঝুঁকি।
নদী পার হওয়ার জন্য বর্তমানে কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। নৌকা ছাড়া নদীর দুই পাড়ের মানুষের চলাচলের বিকল্প পথ প্রায় চার কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। বর্ষায় সেই পথও কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়েই ছোট নৌকায় নদী পার হতে হয় শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগীসহ স্থানীয় সবাইকে।
স্থানীয়রা জানান, কম্পো নদীর গভীরতা প্রায় ৩২ ফুট। স্বাভাবিক সময়ে নৌকায় পারাপার করা গেলেও বর্ষায় পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়ে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট শিশুদের নৌকায় ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। বই-খাতা ও স্কুলব্যাগ নিয়ে প্রতিদিন এভাবে নদী পার হতে গিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয় অভিভাবকদের।
সমস্যা সাময়িকভাবে কমাতে উপজেলা এলজিইডির উদ্যোগে এডিপির অর্থায়নে নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্ষায় নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় সাঁকোটির একাংশ পানিতে তলিয়ে যায়। বাকি অংশ না থাকায় পুরো সাঁকোটিই এখন অচল। ফলে নৌকাই ছিল একমাত্র ভরসা। সেই নৌকাটিও কয়েক মাস আগে ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
মালিদহ গ্রামের অভিভাবকরা জানান, নৌকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রায় পাঁচ মাস ধরে গ্রামের ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। দীর্ঘদিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নদী পার করে স্কুলে পাঠানোর ঝুঁকি নিতেও চাইছেন না।
মালিদহ গ্রামের অভিভাবক আছিয়া খাতুন বলেন, `আমার সন্তানরা পড়াশোনার প্রতি খুবই আগ্রহী। কিন্তু স্কুলে যাওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। কয়েকবার নদী পার হতে গিয়ে তারা বিপদের মুখে পড়েছে। কেউ কেউ সাঁতার কেটেও ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারছে না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।`
স্থানীয়দের দাবি, একসময় নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকটের কারণে নদীর ওপারের অনেক অভিভাবক সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আগ্রহ হারিয়েছেন। ফলে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর জানায়, `নদীতে পানি ও স্রোত বাড়লে নৌকায় পার হওয়ার সময় ভয় লাগে। নৌকায় ওঠার সময় অনেক সময় ভারসাম্য থাকে না। বই-খাতা পানিতে পড়ে যায়। এখন নৌকাটিও ভেঙে গেছে। তাই স্কুলে যাওয়া প্রায় বন্ধ।`
নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা নাসিমা বেগম বলেন, `আমাদের বিদ্যালয়ে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই মালিদহ গ্রামের। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়। কম্পো নদীটি অনেক গভীর। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেন এবং তাদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার বিষয়ে আমরা সবসময় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।`
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, শুধু শিক্ষার্থী নয়, নদীর দুই পাড়ের কয়েক হাজার মানুষ এই যোগাযোগ সংকটে ভুগছেন। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে বাড়তি সময় ও খরচ হয়। জরুরি প্রয়োজনে রোগী হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি আশার খবরও রয়েছে। কেশরহাট পৌরসভার মালিদহ ও নওগাঁ গ্রামের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য কম্পো নদীর ওপর সেতু নির্মাণের একটি প্রস্তাব উপজেলা থেকে পাঠানো হয়েছিল। উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রস্তাবটি অনুমোদন হয়েছে। তবে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।
মোহনপুর উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, `স্থানীয়দের চলাচলের সুবিধার কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের সাময়িক চলাচলের জন্য এডিপির অর্থায়নে উপজেলা এলজিইডির মাধ্যমে নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্ষায় নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় সাঁকোর বাকি অংশ না থাকায় সেটি বর্তমানে অচল হয়ে আছে। নদীটির গভীরতা প্রায় ৩২ ফুট। স্থায়ী সমাধানের জন্য সেতু নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।`
কেশরহাট পৌরসভার প্রশাসক ও মোহনপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানা বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এখানে এ ধরনের সমস্যা ও চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। গত বছর জুন মাসে চলাচলের জন্য একটি বড় নৌকা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেটি ভেঙে গেছে। নতুন করে আরেকটি নৌকার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে সাঁকো নির্মাণের উদ্যোগ নিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
কালের সমাজ/কে.পি

