ঝুমঝুমি, কাঁসর, বাঁশি, বেহালা আর ঢোলের মোহনীয় তালের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল মাগুরার গ্রামীণ জনপদ। আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ও শেকড় সন্ধানী লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার বৈঠাখালী গ্রামে বসেছিল ঐতিহ্যবাহী কবিগানের আসর। গত সোমবার বিকালে শুরু হওয়া এই বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক উৎসব চলে মধ্যরাত পর্যন্ত।
জানা যায়, প্রায় দুইশ’ বছর আগে শ্রীপুর উপজেলার বেঠাখালী গ্রামের বাসিন্দা সুশান্ত কুমার বিশ্বাসের পূর্বপুরুষেরা নিজ বাড়ির আঙিনায় এই কবিগানের সূচনা করেছিলেন। সেই গৌরবোজ্জ্বল ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রতিবছর লক্ষ্মীপূজার পরের দিন স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় এই মিলনমেলার আয়োজন করে আসছে সুশান্ত বিশ্বাসের পরিবার। সময়ের পরিক্রমায় এই আসর এখন পুরো শ্রীপুরবাসীর প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
এবারের আসরের মূল আকর্ষণ ছিল আমন্ত্রিত প্রখ্যাত কবিয়ালদের যুক্তি ও সুরের লড়াই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রবীণ ও নবীন কবিয়ালরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমাজ, ধর্ম ও সমসাময়িক নানা বিষয়কে গানে গানে, সুরে সুরে ফুটিয়ে তোলেন। তাদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিদীপ্ত জবাব, সুরের পসরা এবং পাল্টা যুক্তির লড়াইতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকেন হাজারো দর্শক-শ্রোতা। দলমত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মাগুরা ছাড়াও রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়াড়সহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
কবিগানের এই মহোৎসবকে কেন্দ্র করে বসে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। মেলায় কাঠ, বাঁশ ও মাটির তৈরি তৈজসপত্র, শিশুদের নানা ধরনের খেলনা এবং হরেক রকমের মিষ্টি-মিঠাইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা, যা উৎসবের আমেজকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলা এই কবিগানের আসর গ্রামীণ সৌহার্দ্য, বাঙালি সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের মেলবন্ধনকে আরও একবার সুদৃঢ় করল।
ব্যতিক্রমী এই আয়োজন সম্পর্কে উদ্যোক্তা ও শিক্ষক সুশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই কবিগান আজ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য- নজরকাড়া আধুনিকতার এই যুগে নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের লোকসংস্কৃতির এই অমূল্য সম্পদকে টিকিয়ে রাখা এবং শেকড়ের সন্ধান দেয়া।”
কালের সমাজ/কে.পি

