দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে গাজীপুর প্রেসক্লাবের নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও ভোটগ্রহণ শুরুর মাত্র আধা ঘণ্টা আগে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় নির্বাচন কমিশন। শেষ মুহূর্তে নির্বাচন স্থগিতের ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৬-২৭ মেয়াদের কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠনের জন্য গত ৪ অক্টোবর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়। তফসিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রেসক্লাব ভবনে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণের কথা ছিল। নির্বাচনে ১০০ জন ভোটারের অংশগ্রহণে মোট ১৭টি পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল।
রাতের চিঠি, সকালে নির্বাচন স্থগিত
২৮ অক্টোবর রাতে প্রেসক্লাবের তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর পাঁচ সদস্যের মধ্যে দুজনের স্বাক্ষরসংবলিত একটি চিঠি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে অনিবার্য কারণবশত ২৯ অক্টোবরের নির্বাচন স্থগিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে পুনঃতফসিল ঘোষণার কথাও উল্লেখ করা হয়।
এরপর বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাসুদ রানা এবং নির্বাচন কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জিতু ও মো. বায়েজীদ হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে নির্বাচন স্থগিতের বিষয়টি জানানো হয়।
নির্বাচন স্থগিতের চিঠিতে ‘অনিবার্য কারণ’-এর কথা উল্লেখ করা হলেও ঠিক কী কারণে নির্বাচন বন্ধ করা হলো, তা স্পষ্ট করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ও সাংবাদিকেরা।
সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তাঁরা এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের দিকে নির্বাচন স্থগিতের চিঠি পাঠানো হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর পাঁচ সদস্যের মধ্যে মাত্র দুজনের স্বাক্ষর ছিল। নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না থাকায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সভাপতি পদপ্রার্থী মো. ইকবাল আহমেদ সরকার অভিযোগ করেছেন, একটি পক্ষ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ষড়যন্ত্র করে তা বন্ধ করেছে। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন পর উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল।
এদিকে সাংবাদিকদের একাংশ সিদ্ধান্তটির প্রক্রিয়া ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিন জনের স্বাক্ষরযুক্ত চিঠির ভিত্তিতে নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত কতটা নিয়মসম্মত, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর বক্তব্য
তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর আহ্বায়ক ও টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খান জানিয়েছেন, অনিবার্য কারণে আপাতত নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাসুদ রানা নির্বাচন স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে নির্বাচন স্থগিতের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানান নি ।
স্বচ্ছ তদন্ত ও নতুন তফসিলের দাবি
নির্বাচন স্থগিতের ঘটনায় এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—কোন অনিবার্য কারণে নির্বাচন বন্ধ করা হলো? তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর পাঁচ সদস্যের মধ্যে দুজনের স্বাক্ষরযুক্ত চিঠির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ম কী? নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট বিধি ও গঠনতন্ত্র অনুসরণ করা হয়েছে কি না? পরবর্তী নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে?
এসব প্রশ্নের জবাব দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্বাচন স্থগিতের কারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী নির্বাচনের সময়সূচি সদস্যদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার দাবি উঠেছে।
গাজীপুর প্রেসক্লাবের নির্বাচন স্থগিতের ঘটনায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তবে শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বন্ধ হওয়ার কারণ জনসমক্ষে প্রকাশ, সিদ্ধান্তের নিয়মতান্ত্রিকতা যাচাই এবং দ্রুত পরবর্তী নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হলে পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কমতে পারে।
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে যে নির্বাচনকে ঘিরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ভোটগ্রহণের ঠিক আগে স্থগিত হওয়ায় সেই প্রত্যাশা আপাতত অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও সদস্যদের অপেক্ষা—কর্তৃপক্ষ কবে নির্বাচন স্থগিতের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেবে এবং নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে।
কালের সমাজ/এসআর

