সাতক্ষীরার ৪টি সংসদীয় আসনের রাজনীতির মাঠ এখন নির্বাচনমূখর। আওয়ামী লীগ বিহীন এবারের নির্বাচনে সবখানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মুলত: বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে। জামায়াতের অন্যতম ঘাটি হিসেবে পরিচিত সাতক্ষীরা জেলায় বেশ আগে থেকে সবকটি আসনে জামায়াত তাদের দলীয় প্রার্থী ঘোষনা করায় নির্বাচনের মাঠে তাদের প্রচার-প্রচারণায় কিছুটা এগিয়ে। তবে শুরু থেকে সব কটি আসনে বিএনপি’র একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকা, দলীয় মনোনয়ন ঘোষণা করতে বিলম্ব হওয়া এবং মনোনয়ন বঞ্চিতদের পাল্টা কর্মসুচি থাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে দলটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠ পর্যবেক্ষণ করে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সাতক্ষীরা-১ (তালা ও কলারোয়া): এই আসনে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের আগে থেকে জামায়াতের ঘোষিত প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ। তিনি এলাকার সবখানে আগে থেকে প্রচার প্রচারণার সুযোগ পেয়েছেন। অপরদিকে এই আসনের বিএনপি’র প্রভাবশালী প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব ছিলেন কারাগারে অন্তরীণ। ৫ আগস্টেও পর জেল থেকে বের হলেও নিজ দলের নেতা কলারোয়ার সাবেক মেয়র জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক মো. আক্তারুল ইসলাম নির্বাচনের মাঠে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনিও মনোনয়ন চাওয়ায় কিছুটা চাপে পড়তে হয় হাবিবুল ইসলাম হাবিবকে। মেষমেষ হাবিবুল ইসলাম মনোনয়ন পেলেও নির্বাচনী মাঠে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত একসাথে দেখা যায়নি এইদুজনকে। এই সুযোগে আগে থেকে মাঠে থাকা জামায়াতের প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ নারী কর্মীদের ব্যবহার, স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা এবং পাড়া-মহল্লাভিত্তিক নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন। বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব বর্তমানে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি এবং তার স্ত্রী এখন প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ করছেন।
এই আসনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের শেখ আনসার আলী নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে এই আসনে আওয়ামী লীগের সৈয়দ কামাল বখত নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসনটিতে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচিত হন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আসনটিতে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টির মুস্তফা লুৎফুল্লাহ নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের ফিরোজ আহমেদ স্বপন নির্বাচিত হন।
এবার এই আসনে বিএনপি জামায়াতের বইরে বৈধ অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন, জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিয়াউর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. রেজাউল করিম ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী মো. ইয়ারুল ইসলাম।
আসনটিতে এবার মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮৪৮ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৩ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৭৩ জন। এই আসনে দুইজন হিজড়া ভোটার রয়েছে।
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা): আসনটি সবসময় জেলা সদর উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হলেও এবার প্রথম দেবহাটা উপজেলাকে এই আসনের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে। যে কারনে এবার এই আসনের ভোটের হিসেবে কিছুটা জটিল হবে। এই আসনে বড় দুই শক্তির লড়াই হবে বলে তা সহজে অনুমেয়। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন কেন্দ্রীয় জামায়াতের সাংগঠনিক সেক্রেটারী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এবং বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়ে মাঠে আছেন আলিপুর ইউনিয়নের দীর্ঘ সময়ের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ। তারা উভয়ে প্রতিদিন জনসংযোগ, প্রচার-প্রচারনায় চালিয়ে যাচ্ছেন।
আসনটিতে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১৯৯৬ এর নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী কাজী শামসুর রহমান নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে জামায়াতের আব্দুল খালেক মন্ডল নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে জাতীয় পর্টির প্রার্থী আব্দুল জব্বার নির্বাচিত হন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মীর মোস্তাক আহমেদ নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আশরাফুজ্জামান আশু নির্বাচিত হন। এই আসনে বিএনপি থেকে কখনও কেউ নির্বাচিত হতে পারেননি। তবে এবার দেবহাটা উপজেলাকে সদরের সাথে যুক্ত করায় সদর আসনের হিসেব নিকেশে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলে অনেকের ধারনা। এই আসনে এবার জামায়াত বিএনপির বাইরে জাতীয় পার্টির আশরাফুজ্জামান আশু, এবি পার্টির জি,এম সালাউদ্দীন, জাসদের ইদ্রিস আলী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি রবিউল ইসলাম ও এলডিপি’র শফিকুল ইসলাম শাহেদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
এই আসনে এবার মোট ভোটার ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫৪ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৫ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৫ জন। এই আসনে চারজন হিজড়া ভোটার রয়েছে।
সাতক্ষীরা ৩ আসন (আশাশুনি-কালিগঞ্জ): জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসনে লড়ছেন নির্বাচনের মাঠে ৫ জন প্রার্থী থাকলে লড়াই হবে তিন প্রার্থীর মধ্যে। এই আসনে জেলাবাসীর আশা ভঙ্গ করে বিএনপি’র হেভিওয়েট প্রার্থী ‘গরীবের ডাক্তার’ খ্যাত ডা. শহিদুল আলম মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। ফলে এখানে ত্রিমূখি প্রতিদ্বদিন্বতা হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এই আসন থেকে আগে থেকেই জামায়াতের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে মাঠে আছেন মুহাদ্দিস রবিউল বাশার, বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়ে মাঠে আছে সাবেক এমপি (না-ফি) কাজী আলাউদ্দীন। এই আসনে দলমত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ডা. শহিদুল আলমের গ্রহনযোগ্যতা অনেক উচ্চতায় থাকবার পরও তার মনোনয়ন না দেয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে। ফলে এই আসনে মুলত: ত্রিমূখী নির্বাচন হবে তা স্পস্ট।
সীমানা পূর্ণবিণ্যাসের পূর্বে এই আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী রিয়াছাত আলী বিশ্বাস নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মোখলেসুর রহমান, ২০০১ সালে জামায়াত প্রার্থী রিয়াছাত আলী বিশ্বাস নির্বাচিত হন। আসন পূর্ণবিন্যাস হয়ে দেবহাটা ও কালিগঞ্জের আংশিক যুক্ত করলে ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের ডা. আ ফ ম রুহুল হক নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪,২০১৮ ও সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ডা. আ ফ ম রুহুল হক নির্বাচিত হন। তবে এই আসনে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছাড়া বিএনপি’র দলীয় কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড নেই। তবে তিন দফা আসনটি পূর্ণবিন্যাস হওয়ায় আসনটিতে ভোটের হিসেব কিছুটা ওলট-পালট হতে পারে। তবে জামায়াতের স্থানীয় প্রভাব, ডা. শহিদুল আলমের জনপ্রিয়তা এবং সাবেক এমপি হিসেবে কাজী আলাউদ্দীনের ধানের শীষের প্রতিক পাওয়ায় এই আসনে ত্রিমূখি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এই আসনে জাতীয় পার্টির আলিপ হোসেন ও বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি-বিএমজেপি’র প্রার্থী রুবেল হোসেনও প্রার্থী হিসেবে মাঠে নির্বাচন করছেন।
সাতক্ষীরা-৩ আসনে এবার মোট ভোটার ৫ লাখ ২ হাজার ২২১ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ২৩৫ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৩ জন। এই আসনে তিনজন হিজড়া ভোটার রয়েছে।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর): সুন্দরবন ঘেষা সাতক্ষীরা-৪ আসনটি কিছুটা বৈচিত্রময়। এখানে সব দল থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। জামায়াত দলীয় সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলাম এলাকার পরিচিত মুখ। অন্যদিকে বয়সে তরুন বিএনপির প্রার্থী ড. মনিরুজ্জামান।
এই আসনে সাবেক জাতীয় পার্টিও এমপি এইচএম গোলাম রেজা ও তার ছেলে হুসেইন মুহাম্মদ মায়াজের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। গাজী নজরুল ইসলাম এই আসন থেকে দুইবার এমপি থাকার কারনে তিনি কিছুটা কাজ করতে সুযোগ পেয়েছিলেন। তার সুফল তিনি এবার ঘরে তুলতে চান। তবে বয়সে তরুন দীর্ঘ সময় লন্ডনে থাকা মনিরুজ্জামানও বেশ কয়েকবছর যাবত এলাকার মানুষের পাশে বিভিন্নভাবে সহায়তা করা চেষ্টা করেছেন। তরুন ভোটারদের মাঝেও তার ক্লিন ইমেজ রয়েছে। যে কারনে আসনটিতে লড়াইটি বেশ উপভোগ্য হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলায় পাঁচটি সংসদীয় আসন ছিল। এক্ষেত্রে জেলার শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে ছিল সাতক্ষীরা-৫ আসন। ২০০৮ সালে সাতক্ষীরা জেলা থেকে একটি আসন কমিয়ে চারটি আসন করা হয়। যেখানে শ্যামনগরের সঙ্গে কালিগঞ্জের আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠন করা হয় সাতক্ষীরা-৪ আসন। এভাবেই চলেছে ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত। এবার সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। যেখানে শুধুমাত্র শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসন।
তথ্য মতে, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির শেখ আবুল হোসেন, ১৯৯১ সালে জামায়াতের গাজী নজরুল ইসলাম, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের একে ফজলুল হক, ২০০১ সালে জামায়াতের গাজী নজরুল ইসলাম এবং ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির এইচএম গোলাম রেজা, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের জগলুল হায়দার সবশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের আতাউল হক দোলন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আসনটিতে বিএনপি জামায়াতের বইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এস,এম, মোস্তফা আল মামুন প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন।
এই আসনে এবার মোট ভোটার ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮৬৬ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৪ জন এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯১৮ জন। এই আসনে চারজন হিজড়া ভোটার রয়েছে।
সব মিলিয়ে সাতক্ষীরা জেলায় জামায়াতের কিছুটা আধিক্য থাকলেও এবার ৪টি আসনেই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে বিএনপির সাথে। তবে শেষ হাসি কে হাসবে তার জন্য সাতক্ষীরাবাসিকে অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ।
কালের সমাজ/এসআর

