ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে ভৈরবীতে রাগালাপ, বাণী ও ছন্দে নতুন বছর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ভোর সোয়া ৬টায় রাজধানীর রমনার বটমূলে এ ঐতিহ্যবাহী প্রভাতী অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
এবারের বার্তা, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ সেখানেই বাঙালির জয়। ছায়ানটের ৫৯তম অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতি এবং মানব ও দেশপ্রেমের গানের পাশাপাশি থাকছে লোক জনজীবনের সুর দিয়ে।
সব মিলিয়ে বাঙালি সমাজকে বিগত বছরের সব ‘প্রতিকূলতা, আবর্জনা’ দূর করে নতুন বছরে ‘আরো মানবমুখী’ হওয়ার প্রত্যয়।
এদিন আজন্ম বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে নিয়োজিত ছায়ানটের এবারের আহ্বান, ‘আমরা নির্বিঘ্নে সংস্কৃতি চর্চা করতে চাই’।
নতুন বছরকে বরণ করতে আয়োজনের কমতি নেই রমনার বটমূলে। বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করে ঐতিহ্যগতভাবে বর্ষবরণের আয়োজন করে আসছে ছায়ানট। নতুন বছরকে তাই বরণ করে নেওয়া হয় সুরের মূর্ছনায়।
ভোর সোয়া ৬টায় অনুষ্ঠান শুরু হয় ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের পরিবেশনা দিয়ে। এবারও অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁইর গান, লোকগানের পাশাপাশি, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান দিয়ে।
এছাড়া এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষ সংযোজন থাকছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ ও প্রয়াত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা গীতিকার সুরকার ও চিত্রশিল্পী মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের গান দিয়ে। মোট ২২টি গান পরিবেশিত হবে প্রায় দুই ঘণ্টার এ অনুষ্ঠানে। এর মধ্যে আটটি সমবেত সংগীত, আর একক কণ্ঠের গান রয়েছে ১৪টি। পাঠ থাকছে দুটি। ছায়ানটের শিশু বিভাগের শিক্ষার্থীসহ সব বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশিষ্ট শিল্পী মিলিয়ে প্রায় ২০০ শিল্পী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
এদিকে গতকাল ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা বলেছেন, বাঙালি যখন আপন বর্ষবরণের আয়োজন করছে, তখন মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধবাজরা হাজার বছরের পারস্য সভ্যতার ধ্বংসলীলায় মত্ত, বিশ্ব জনজীবন বিপর্যয়ের সম্মুখীন। সব শঙ্কা-অনিশ্চয়তা-আতঙ্কের অবসান চায় ছায়ানট, প্রত্যাশা করে মানবজাতির শান্তি-কল্যাণ-স্বস্তি। স্বপ্ন দেখে, পৃথিবী জুড়েই মানবতা-সংহতি-সাম্য-সম্প্রীতির ফুল ফুটবে।
ছায়ানটের ভাষ্য, সংকল্প হোক, মিলিত পথের সাথী হয়ে অন্ধকারের অর্গল খুলে, আলোর ভুবনে যাত্রা।
জানা গেছে, বরাবরের মতোই সংস্কৃতিবিরোধী অপশক্তিকে তুচ্ছ করে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বাঙালি তার সর্ববৃহৎ উৎসব নতুন বছর বরণে ভয়কে জয় করার প্রত্যয় নিয়ে বাংলা নতুন বছরের ভোরে কণ্ঠ ছেড়ে গান গাইছে ছায়ানট। এবার মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধবাজরা হাজার হাজার বছরের পারস্য সভ্যতা ধ্বংসলীলায় মত্ত হয়েছে, বিশ্ব জনজীবন যখন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, তখন শান্তি-কল্যাণ-স্বস্তির আকাঙ্ক্ষাও থাকবে ছায়ানটের আয়োজনে।
দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংস্থা ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার এ বটমূলে পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। সে বছর রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনে নববর্ষ বরণের প্রভাতি অনুষ্ঠানের প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল ভয়ের পরিবেশ থেকে বের হয়ে এসে সংগীতের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়কে তুলে ধরা। পয়লা বৈশাখের এ অনুষ্ঠান কালক্রমে দেশের সব ধর্ম, বর্ণের মানুষের কাছে এক অভিন্ন উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবারও ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করা হলো রমনার এ বটমূল থেকেই।
১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ উৎসব ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পহেলা বৈশাখে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়। কোভিডের দুই বছর এ আয়োজন হয় ভার্চুয়ালি। ২০০১ সালে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। তাতে ১০ জন নিহত হন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে প্রতিবছর বর্ষবরণের এ আয়োজন চলছে।
কালের সমাজ/এসআর

