ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩

অঝোর বৃষ্টিতে জলমগ্ন ঢাকা স্থগিত স্কুল পরীক্ষা, দুর্ভোগে অফিসগামী মানুষ

বিশেষ প্রতিনিধি | জুলাই ১২, ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম অঝোর বৃষ্টিতে জলমগ্ন ঢাকা স্থগিত স্কুল পরীক্ষা, দুর্ভোগে অফিসগামী মানুষ
ছবি সংগ্রহ

কয়েকদিনের টানা বর্ষণে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা, পাহাড়ধস, প্রাণহানি ও পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগের মধ্যে এবার রাজধানী ঢাকাও কার্যত জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হয়েছে। শনিবার গভীর রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত টানা অঝোর বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলি পানিতে তলিয়ে যায়। 

কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মস্থলে যেতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন হাজারো অফিসগামী মানুষ।

ভোর থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত টানা মুষলধারে বৃষ্টিতে রাজধানীর গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, শেওড়াপাড়া, মণিপুর, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২, মোহাম্মদপুর, বিজয়নগর, কলাবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক পানিতে ডুবে যায়। অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষকে পানি ভেঙে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।

শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম জানান, মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শেওড়াপাড়া শাখা-৩-এর সামনে প্রধান সড়ক এবং আশপাশের অলিগলি পানিতে ডুবে যাওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চললেও অভিভাবকদের অনুরোধে কর্তৃপক্ষ ওই শাখার দিনের সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে।

ক্রিসেন্ট রোডের বাসিন্দা শামিমা নাসরিন বলেন, তাঁদের এলাকার রাস্তায় কোমরসমান পানি জমেছে। অনেক বাড়ির নিচতলাতেও পানি ঢুকে পড়েছে, ফলে বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

অফিসগামী মানুষের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। পানি জমে থাকার সুযোগে রিকশাভাড়া দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। সংবাদকর্মী পার্থ শংকর সাহা জানান, মণিপুরী পাড়া থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত যেতে তাঁকে ৪০০ টাকা রিকশাভাড়া দিতে হয়েছে। অথচ সাধারণ সময়ে এই ভাড়া অনেক কম। তিনি বলেন, ভেতরের গলিগুলোতেও পানি জমে থাকায় বের হওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

আরেক সংবাদকর্মী অনিন্দ্য সাইমুম জানান, সকাল সাড়ে ছয়টায় আদাবর থেকে বের হয়ে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর এলাকার হাঁটুপানি পেরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়েছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সংবাদকর্মী জিনিয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, কলাবাগান থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত গ্রিন রোড ও পান্থপথে হাঁটুপানি থাকায় চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে।

শুধু অফিসগামী নয়, জরুরি কাজে বের হওয়া নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরাও চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক স্থানে যানজটের পাশাপাশি বিকল হয়ে পড়ে ছোট যানবাহন। কোথাও কোথাও ড্রেনের ঢাকনা পানির নিচে ঢেকে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিকুল নেওয়াজ কবীর জানান, শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় রাজধানীতে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মাসে এ সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। তাঁর মতে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

দেশজুড়ে বন্যা ও টানা বর্ষণের প্রভাবে যখন লাখো মানুষ পানিবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন, তখন রাজধানীর সামান্য কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 

জলাবদ্ধতা, স্থবির যান চলাচল, শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং কর্মজীবী মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ নগরবাসীর কাছে এক পরিচিত কিন্তু অমীমাংসিত সংকট হিসেবেই ফিরে এসেছে।
কালের সমাজ/এএইচবি 

Link copied!