২০১৭ সালে হাইকোর্ট রাজধানী ঢাকায় চলাচলকারী যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার, উৎপাদন ও আমদানি বন্ধ এবং বাজারে থাকা এসব হর্ন জব্দের নির্দেশ দিয়েছিলো। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দশনা সত্ত্বেও জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হাইড্রোলিক ও অপ্রয়োজনীয় হর্নের ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং বিদ্যমান আইন থাকা সত্ত্বেও বহু যানবাহনে অবাধে এসব হর্ন ব্যবহার করা হচ্ছে, যা শব্দদূষণ বাড়িয়ে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। বিধিমালায় প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে, পুনরাবৃত্ত অপরাধে শাস্তি আরও কঠোর।
কোনো যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারের ছবি বা ভিডিও ধারণ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেজ, ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ অভিযোগ জানাতে পারেন। যানবাহনের নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করে বিআরটিএর মাধ্যমেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

মারাত্মক শব্দদূষণে ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য: ছবি সংগ্রহ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, হাইড্রোলিক হর্নের তীব্র শব্দদূষণ মা ও অনাগত শিশুর জন্য অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। হাইড্রোলিক হর্নের উচ্চ শব্দ যা প্রায়ই ১২০ ডেসিবেল বা তার বেশি হয়, তাতে মা ও গর্ভস্থ শিশুর ওপর বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ৮৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দের মাঝে দীর্ঘ সময় থাকলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর ১২০ ডেসিবেলের মতো তীব্র শব্দ তাৎক্ষণিক কানের ক্ষতি বা ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে।
গর্ভাবস্থার ২৪ সপ্তাহের পর থেকে শিশু বাইরের শব্দ শুনতে শুরু করে। তীব্র শব্দদূষণের ফলে গর্ভস্থ শিশুর কানের ভেতরের সূক্ষ্ম কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সন্তান বধির বা আংশিক বধির হয়ে জন্মাতে পারে।
আকস্মিক বিকট শব্দে গর্ভবতী মায়ের হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে যায়, শরীরে স্ট্রেস হরমোন (যেমন কর্টিসল) নিঃসৃত হয় এবং রক্তচাপ সাময়িকভাবে অনেক বৃদ্ধি পায়।
শব্দে সরাসরি বাচ্চা স্থানচ্যুত না হলেও, হঠাৎ বিকট শব্দে মা যদি মারাত্মকভাবে ভয় বা শক পান, তবে জরায়ুর পেশির তীব্র সংকোচনের ফলে ক্ষেত্রবিশেষে গর্ভপাত বা প্রি-ম্যাচুর বার্থ (সময়ের আগে প্রসব)-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নিয়মিত অতিরিক্ত শব্দদূষণের মধ্যে থাকলে গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে এবং জন্মের সময় বাচ্চার ওজন কম হতে পারে।

অতিরিক্ত শব্দদূষণে নাজুক পরিস্থিতিতে শিশুরা : ছবি সংগ্রহ
সম্প্রতি ঢাকায় শব্দদূষণ কমাতে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এ লক্ষ্যে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নির্ধারিত নীরব এলাকায় স্পষ্ট সাইনবোর্ড স্থাপন এবং জনসচেতনতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ডিএমপি সদরদপ্তরে ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, যানজট নিরসন, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জনসেবার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন। সভায় মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়েও কর্মকর্তারা মতামত দেন।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, শব্দদূষণ শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। তাই নীরব এলাকায় অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো নিরুৎসাহিত করতে দৃশ্যমান সাইনবোর্ড স্থাপনের পাশাপাশি চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। তিনি আরও বলেন, রাজধানীতে কার্যকর ও জনবান্ধব ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং নাগরিকদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত অভিযান, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং চালক-যাত্রীসহ সবার সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার পরিহার এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার মাধ্যমে একটি শান্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তোলা সম্ভব।

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতার অংশ হিসাবে নগরীর রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ : ছবি সংগ্রহ
এর আগে ২০২২ সালে তৎকালীন পরিবেশ মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছিলেন, ঢাকায় শব্দদূষণ কমাতে আগামী দুই মাসের মধ্যে যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন সম্পূর্ণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
২৭তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৭) বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, চালক সমিতি, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
হাইড্রোলিক হর্ন আইনত নিষিদ্ধ এবং কোনো অবস্থাতেই এর ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়। গণমাধ্যমের সহযোগিতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এটি বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন।
পরিবেশমন্ত্রীর সেই ঘোষণার পর প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পরিবর্তে প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় হর্ন ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। ঘোষণা, প্রতিশ্রুতি ও সচেতনতামূলক বক্তব্যের বাইরে বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের অভাবই বেশি চোখে পড়েছে।
কালের সমাজ/এএইচবি

