পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং লাখো বর্জ্য সংগ্রহকারীর জীবিকা রক্ষায় বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং, কম্পোস্টিং এবং জিরো ওয়েস্টভিত্তিক টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদ, বর্জ্যজীবী প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের নেতারা। তাদের মতে, বর্জ্য পোড়ানো কোনো আধুনিক বা পরিবেশবান্ধব সমাধান নয়, বরং এটি বায়ুদূষণ বৃদ্ধি, বিষাক্ত ছাই উৎপাদন, জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকি এবং দেশের শক্তিশালী রিসাইক্লিং খাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটে অনুষ্ঠিত বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন: পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, রিসাইক্লিং এবং বর্জ্যজীবীদের জীবিকার উপর প্রভাব শীর্ষক এক পরামর্শ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। গ্রাম বাংলা উন্নয়ন কমিটি, আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, গ্লোবাল গ্রিনগ্রান্টস ফান্ড, জিএআইএ, ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ওয়েস্ট পিকার্স এবং বাংলাদেশ ওয়েস্ট পিকার্স ইউনিয়ন যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
সভায় বক্তারা বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য পোড়ানো হলে প্রতি ৪ টন বর্জ্য থেকে প্রায় ১ টন বিষাক্ত ছাই উৎপন্ন হবে। এই ছাই কৃষিজমি, নদী-নালা, ভূগর্ভস্থ পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করবে। একই সঙ্গে বর্জ্য পোড়ানোর ফলে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যান্সার, হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এবং অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পরিবেশবিদদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্যের বাজার রয়েছে এবং প্রতিবছর প্লাস্টিকের চাহিদা প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। দেশে ব্যবহৃত মোট প্লাস্টিকের প্রায় ৫০ শতাংশই পুনর্ব্যবহৃত বা রিসাইকেল করা প্লাস্টিকের মাধ্যমে পূরণ হয়। এই রিসাইক্লিং শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হলো হাজার হাজার বর্জ্য সংগ্রহকারী। কিন্তু বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও অন্যান্য উপকরণ সরাসরি চুল্লিতে চলে যাবে, ফলে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সভার সভাপতিত্ব করেন আর্থ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আমিনুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একেএম মাকসুদ। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ওয়েস্ট পিকার্স ইউনিয়নের সভাপতি রীনা বেগম, সাধারণ সম্পাদক কুলসুম বেগম, বিএমএসএফের নির্বাহী পরিচালক খায়রুজ্জামান কামাল, প্রত্যাশা মাদকবিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদ, গ্রাম বাংলা উন্নয়ন কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ রাসুল এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বারিশ চৌধুরী।
বাংলাদেশ ওয়েস্ট পিকার্স ইউনিয়নের সভাপতি রীনা বেগম বলেন, আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের বিপক্ষে নই। তবে নতুন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আমাদের কাজ, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করেই, তবে বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণ সম্পাদক কুলসুম বেগম বলেন, আমরা প্রতিদিন ময়লার স্তূপ থেকে প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতুসহ বিভিন্ন পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ করে পরিবার চালাই। যদি এসব উপকরণ পুড়িয়ে ফেলা হয়, তাহলে আমাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা কর্মহীন হতে চাই না।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমানে বিশ্বে বছরে প্রায় ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন টন পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বেড়ে ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলেও বছরে প্রায় ১৭ দশমিক ২ মিলিয়ন টন পৌর কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এই বিপুল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশবান্ধব, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
সমাজ সংস্কারক ও সংবাদকর্মী নাসরীন সুলতানা বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা এবং থ্রি-আর (Reduce, Reuse, Recycle) কৌশলের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি কম্পোস্টিং, উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং জিরো ওয়েস্ট নীতি অনুসরণ করলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে।
ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল বর্জ্য ভাগাড় এলাকা থেকে ২০ জন বর্জ্য সংগ্রহকারী অংশ নেন। তারা ভাগাড় থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহের অধিকার, সিটি করপোরেশনের অধীনে কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন নাগরিক সমাজ সংগঠন, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী, গণমাধ্যমকর্মী এবং অর্ধশতাধিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিনিধি অংশ নেন।
সভা থেকে বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, জ্বালানি পুনরুদ্ধারের নামে এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত নয়, যা জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, পুনর্ব্যবহার শিল্প এবং লাখো মানুষের জীবিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের জন্য বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের কার্যকর উপায় হলো পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং ও কম্পোস্টিংভিত্তিক আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য দহন নয়।
কালের সমাজ/এএইচবি

