ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

নিভু নিভু জীবনপ্রদীপ: এক নিঃস্ব আলোকবর্তিকার গল্প

জেলা প্রতিনিধি, বাগেরহাট | সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম নিভু নিভু জীবনপ্রদীপ: এক নিঃস্ব  আলোকবর্তিকার গল্প

চিতলমারী থানা প্রেস ক্লাবের আঙিনা পেরিয়ে যখন এই বিষণ্ণ সংবাদটি পত্রিকার পাতায় তুলে ধরার জন্য আমার কাছে এসে পৌঁছাল, তখন হৃদয় এক অব্যক্ত বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। জগতের নিয়ম বড়ই বিচিত্র ও নির্মম। যে মানুষটি আজীবন নিজের হৃদয়ের উত্তাপ দিয়ে অন্যের পথের অন্ধকার দূর করেছেন, জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি নিজেই আজ চরম অবহেলা আর অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত। বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের এক নিভৃত কোণে আজ নিঃশব্দে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন একসময়ের কলমযোদ্ধা ও সমাজসেবী জুড়ান চন্দ্র মণ্ডল। 

পেশায় তিনি ছিলেন একজন নিতান্তই সাধারণ দর্জি। সুঁই-সুতোর বুননে তিনি কেবল মানুষের পোশাকই তৈরি করতেন না, গভীর মমতায় বুনতেন সমাজের ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর দর্জির কাজ করে যে সামান্য অর্থ তার উপার্জিত হতো, নিজের সংসারের তীব্র অভাব-অনটনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তা দিয়ে তিনি হাসি ফোটাতেন গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মলিন মুখে। পরম স্নেহে তাদের হাতে তুলে দিতেন বই, খাতা আর শিক্ষার নানা অপরিহার্য উপকরণ। একটি অক্ষরও যেন কোনো শিশুর জীবন থেকে দারিদ্র্যের নির্মম কশাঘাতে হারিয়ে না যায়, সেদিকেই ছিল তার একনিষ্ঠ সাধনা। অক্ষরের প্রতি এক অদ্ভুত এবং নিঃস্বার্থ প্রেম ছিল এই স্বশিক্ষিত মানুষটির। তিনি কেবল অন্যের শিক্ষার ব্যবস্থাই করেননি, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা নানা অসংগতি দূর করতে নিয়মিত কলম ধরেছেন। সমাজকে জাগিয়ে তুলতে, মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে নাড়া দিতে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে অজস্র নাটক লিখেছেন এবং পরম উৎসাহে তা মঞ্চায়নও করেছেন। 

মানুষের মাঝে সচেতনতার বীজ বপন করতে গিয়ে তিনি নিজের কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলেন। অথচ, যে সমাজের জন্য তিনি নিজেকে তিল তিল করে উজাড় করে দিয়েছেন, আজ সেই সমাজ বড়ই নিশ্চুপ। গত ছয়টি মাস ধরে এক নিষ্ঠুর স্ট্রোক তার শরীরের একপাশ সম্পূর্ণ অচল করে দিয়েছে। যে মানুষটি বিরামহীন ছুটে বেড়িয়েছেন অন্যের কল্যাণে, আজ তিনি জরাজীর্ণ এক বিছানায় অসহায় বন্দি। অর্থের অভাবে তার কোনো চিকিৎসাই হচ্ছে না। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দ্রুত উন্নত চিকিৎসা না পেলে এই নিভৃতচারী আলোকবর্তিকাকে হয়তো আর বাঁচানো সম্ভব হবে না। 

অভাবের যে সংসারে নিত্যদিনের আহার জোটানোই এক কঠিন সংগ্রাম, সেখানে এমন ব্যয়বহুল চিকিৎসা যেন এক মরীচিকা। তবে আশার কথা এই যে, সাংবাদিকদের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী অফিসার খাদিজা আক্তারের কানেও পৌঁছেছে এই হাহাকারের কথা। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জুড়ান চন্দ্র মণ্ডলের বাড়িতে গিয়ে তার পাশে দাঁড়াবেন, চিকিৎসার সকল খোঁজখবর নেবেন। কিন্তু এ দায়িত্ব কেবল প্রশাসনের একার নয়। যে মানুষটি সারা জীবন নিঃস্বার্থভাবে সমাজের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, আজ সেই সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কি উচিত নয় তার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো? সবার একটু সম্মিলিত মমতার হাত প্রসারিত হলে হয়তো আবারও নতুন করে জ্বলে উঠতে পারে নিভু নিভু এই জীবনপ্রদীপ।

কালের সমাজ/কে.পি
 

Link copied!