ঢাকা শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২৩ মাঘ ১৪৩২
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

পাল্টাপাল্টি কথার লড়াইয়ে ব্যস্ত বিএনপি-জামায়াত

বিশেষ প্রতিনিধি | ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ১০:১৪ পিএম পাল্টাপাল্টি কথার লড়াইয়ে ব্যস্ত বিএনপি-জামায়াত

আগামী সাপ্তাহের শেষদিন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেষ সময়ে এসে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা মেতে উঠছেন কথার লড়াইয়ে। ভাটের মাঠের বিভিন্ন সমাবেশে একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি কিংবা গুপ্ত পরিভাষা ব্যবহার করে কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন। শুধু তাই নয়, ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে অবস্থানসহ ভোটের মাঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন নারীদের নিয়ে দল দুটির দেয়া নানা প্রতিশ্রুতি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের মাঠে যতটা সম্ভব সহনশীল হতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। কাঁদা ছোঁড়াছুড়ির প্রভাবে তৃণমূলে ঘটতে পারে বড় ধরনের সহিংসতা। একইসঙ্গে কাঁদা ছোড়াছুড়ির ফলে ভোটের মাঠে এবার অন্য যেকোনোবারের চেয়ে সহিংসতা বাড়ার শঙ্কা তাদের।

এক্স আইডি হ্যাকের বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, আমার এক্স আইডি হ্যাক করে অত্যন্ত নোংরা মেসেজ সেখান থেকে দেয়া হয়েছে। তবে তারেক রহমান তার এক নির্বাচনি প্রচারণা সমাবেশের মঞ্চে দেয়া বক্তব্যে এ বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন।

তার ভাষ্য, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভাবে আইডি হ্যাক হতে পারে না। ভোটের মাঠে দুই প্রতিপক্ষ দলের প্রধানের কথার লড়াই, ২২ জানুয়ারি নির্বাচনি প্রচারণার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর দিন থেকে এর মাত্রা বাড়ে কয়েকগুণ। এই যেমন বিএনপি ফ্যামিলি কার্ডের ঘোষণার পরই জামায়াত আমিরের ঘোষণা ছিল কারো হাতে ফ্যামিলি কার্ড নয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশ্বাসী তারা। প্রচারণার দ্বিতীয় দিনই পঞ্চগড়ে জামায়াত আমির তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বসন্তের কোকিলের সাথে তুলনা করলে বিএনপি চেয়ারপার্সনের আলোচনায় ছিল জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে ‘গুপ্ত’ পরিভাষার ব্যবহার।

কথার লড়াইয়ের এই আবহে উঠে আসে দুর্নীতি, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দল দুটির অবস্থানসহ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে কন্ঠস্বরের মাত্রা। নির্বাচনে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দলদুটোর ঘোষণাও ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও সবশেষ পহেলা ফেব্রুয়ারি জামায়াত আমীরের টুইটার এক্স একাউন্টের পোস্ট ঘিরে রাজনীতির মাঠে এখন ভিন্ন আবহ। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় শক্তিমত্তার প্রদর্শন ঘিরে সহিংসতার ঘটনাও কম নয়। যদিও দুই দলের শীর্ষ প্রতিনিধিদের ভাষ্য সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটার আকৃষ্ট করতে চলছে জনমুখী কর্মসূচির পরিকল্পনা।

এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের কাছে প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজ নিজ কৌশলে ছুটে যাবে। আমরা এতটুকুই নিশ্চিত করতে চাই যে, নির্বাচনটা যেন স্বচ্ছ হয়, অবাধ হয়।

পাল্টা জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমরা সবসময় পজিটিভ। আমরা কারও কোনো কথায় উত্তেজিত হই না। বরং আমরা আমাদের নীতি-পলিসি, পদ্ধতি, আমাদের চিন্তা এগুলো আমরা মানুষের সঙ্গে শেয়ার করি যে, কীভাবে আমরা এ দেশটাকে আরও সুন্দর করতে পারি, ভালো করতে পারি।

একইভাবে মিরপুর-১২ নম্বরের ডি ব্লকে প্রচার চালানোর সময় বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক জামায়াতের নাম ধরেই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, একটি দল জামায়াত, তারা ক্ষমতার মোহে পড়ে, ক্ষমতার লোভে, মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে বিকাশে নম্বর নিচ্ছে। ঘরে ঘরে গিয়ে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই বিষয়গুলো নেতা-কর্মীদের চোখে পড়েছে। জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল বাতেনও কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে প্রচার চালানোর সময় বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, বিএনপির প্রার্থী মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন থেকে শুরু বিভিন্ন মানুষকে খামে করে টাকা দিচ্ছেন।

ভোটাররা চান সমস্যার সমাধান: দুই পক্ষের প্রার্থীরা যখন পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগমুখর, তখন স্থানীয় লোকজন চাইছেন তাঁদের এলাকার সমস্যা সমাধান।

পল্লবীর কালশী বিহারি ক্যাম্পে গিয়ে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বিহারি ক্যাম্পের নানা সমস্যার কথা বলেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মাদকের আধিপত্য। এই মাদকের সঙ্গে প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাও জড়িত। মাদক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি প্রার্থীরা দিচ্ছেন। তবে কোনো প্রার্থীই এই সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না জাহাঙ্গীরের। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত বুঝি না, যে সমস্যার সমাধান করতে উদ্যোগী হবে, তাকেই আমরা ভোট দেব। জাহাঙ্গীরের পাশাপাশি কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পের আরও ছয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তাঁরা মোটাদাগে বলেছেন, তাঁদের কাজের অভাব রয়েছে। শিক্ষার সুযোগও কম। বিদ্যুৎ ও পানি নিয়ে চাঁদাবাজি আছে। এসব বন্ধে প্রতিশ্রুতি চান তাঁরা।

মিরপুর-১২ নম্বরের ডি ব্লকের মুসলিম বাজার ঢাল এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেছেন, এলাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সমস্যাও প্রকট। এসব সমস্যার সমাধান করার কথা বলেন তিনি।

খুলনা-৫ আসনে কালো টাকা ছড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াত প্রার্থী ও দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এসময় সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সংশয় জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা প্রেসক্লাবে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এমন অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগেও প্রার্থীদের ওপর হামলা, নারী কর্মীদের হেনস্তা ও প্রচারণায় বাধা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে খুলনা-৫ আসনে জলাবদ্ধতা নিরসনই হবে প্রথম কাজ। এছাড়া বন্ধ কলকারখানাগুলো চালু ও আধুনিকায়ন করা, বেকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

এ বিষয়ে ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক দলগলো ৫ আগস্টের পরে যে ধরনের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া উচিত ছিল, তারা দিচ্ছে না। তারা মানুষের কথা ভাবছে না। এই জিনিসটা যদি তারা বুঝতেন, তাহলে তো তারা সেখান থেকে সরে আসতো। কিন্তু তারা যেটা দেখছে যে, তারা আমাকে ঢিল মারলে, আমাকে পাটকেলটা মারতে হবে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশন যেন প্রতিনিয়ত প্রার্থীদের ব্যয় পর্যবেক্ষণ করে। টাকার খেলা বন্ধ করতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন কখনো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানে সবার সমান সুযোগ, সবার প্রতি সহিষ্ণু আচরণ। আমরা লক্ষ করছি, বিভিন্ন পক্ষ অন্য পক্ষকে সেই সুযোগটা দিতে চাইছে না। অনেক জায়গায় আমরা লক্ষ করেছি যে, অমুক দল, অমুক এলে আমি আসব না, অমুক প্রার্থী থাকলে আমি থাকব না। এটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, আপনি যখন আমিত্ব ঘোষণা করেন, আপনার আচরণে যখন প্রকাশিত হয় যে, আসলেই আপনি অন্যকে গ্রহণ করা বা সহ্য করার ক্ষমতা রাখেন না, তাহলে আপনি কীসের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কথা বলেন? এ বিশ্লেষক মনে করেন, রাজনৈতিক এসব ঝগড়ায় আহত ভোটাররা। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দলগুলোকে নিতে হবে সৃজনশীল সব কর্মসূচি। আব্দুল লতিফ মাসুম বলেন, বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক যে, আমরা একটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারিনি।

কালের সমাজ/এসআর

Side banner
Link copied!