ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

ক্রমেই তীব্র হচ্ছে নির্বাচনী সহিংসতা

বিশেষ প্রতিনিধি | জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ১০:১২ পিএম ক্রমেই তীব্র হচ্ছে নির্বাচনী সহিংসতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১০ দিন। এরই মধ্যে ভোটের প্রচারণা ঘিরে দেশজুড়ে সহিংসতায় নির্বাচনের দিন নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। পুলিশের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও ইতোমধ্যেই প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের প্রচারণার মাঠে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। প্রার্থীদের পারস্পরিক দোষারোপ, অতীতের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, নিরাপত্তা ইস্যু এবং প্রকাশ্য হুমকির ভাষা নির্বাচনী পরিবেশকে ক্রমেই অস্বস্তিকর করে তুলছে। এককথায় বলতে গেলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। খুনোখুনির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ভোটার ও  নাগরিক সমাজে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোকে আরো দায়িত্বশীল ও তৎপর হতে হবে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটের মাঠে আতঙ্ক দূর করতে হবে। অন্যথায় ভোটাররা উৎসাহ হারাবেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আট দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি। এতে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩৫৩ জন। ১ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ৬৫টি। এতে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৫৫৫ জন।

সর্বশেষ গতকাল শনিবার সকালে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে জামায়াতের ইউনিয়ন আমিরসহ ১০ জন ও বিএনপির ৫ কর্মী আহত হয়েছেন।

গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মুলাইপত্তন গ্রামের চৌকিদার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
আহতদের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া গুরুতর আহত জামায়াতের দুই জনকে ভোলা জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় একে অপরকে দুষছেন দুই দলের নেতাকর্মীরা।

জামায়াতের আহতদের মধ্যে রয়েছেন- টগবী ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল হালিম, কর্মী ফয়জুল্লাহ, ইমন, শাহেল আলম, রাইহান, শামীম, রাতুল ও তানজিল। বিএনপির আহতদের মধ্যে রয়েছেন- আয়ুব আলী, শিমু বেগম, বাবু, শামিম ও উজ্জলা বিবি।

আমাদের ভোলা প্রতিনিধি এম এ আকরাম জানান, সকাল ৮টার দিকে টবগী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে ২০-৩০ জন জামায়াত নেতাকর্মী ভোলা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মুফতি ফজলুল করিমের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। এ সময় তারা বিএনপি কর্মী আয়ুব আলীর বাড়িতে প্রচারণার জন্য প্রবেশ করলে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে দুই দলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা হাতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। আহতদের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে খবর পেয়ে যৌথবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মাকসুদুর রহমান বলেন, প্রতিদিনের ন্যায় আজও আমাদের নেতাকর্মীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রচারণা চালাচ্ছিল। পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিএনপি কর্মীর আয়ুব আলী ও তার ভাইয়ের নেতৃত্বে বিএনপি নেতাকর্মীরা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় এবং ১০-১২ জনকে আহত করেছে। গুরুতর আহত দুই জনকে ভোলা জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

তবে জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ অস্বীকার করে বোরহানউদ্দিন উপজেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মো. আজম বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং কমপক্ষে ৫ জনকে আহত করে তাদের বাড়িঘরেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। আমরা আইনি ব্যবস্থা নেবো।

বোরহানউদ্দিন থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। তবে এখনও কোনও দলের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর একটি সমাবেশ শেষে ফেরার পথে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ হামলার জন্য বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দায়ী করেছে জামায়াত। ঘটনায় শিবির সভাপতিসহ অন্তত পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র।

শনিবার (৩১ জানুয়ারি) বিকেলে উপজেলার জগন্নাথদিঘী ইউনিয়নের হাটবাইর গ্রাম এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি শেষে জামায়াতের নেতাকর্মীরা বাড়ি ফেরার পথে হাটবাইর এলাকায় পৌঁছালে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র হামলা চালায়। এ সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে চৌদ্দগ্রাম দক্ষিণ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতিসহ জামায়াত–শিবিরের পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চৌদ্দগ্রাম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোরশেদ বলেন, এলাকায় সংঘর্ষ চলছে। আমরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত রয়েছি। একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে খবর পেয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমির মু. মাহফুজুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে আগে থেকেই হামলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। আমাদের নেতাকর্মীরা সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। এতে অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন।

উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি বেলাল হোসাইন দাবি করেন, বিএনপি নেতা মিজান খান, গাজী ইয়াছিন ও মোবারক চৌধুরীর নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয়। এতে জামায়াতের তিনজন সমর্থক আহত হয়েছেন বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে, হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপির জগন্নাথদিঘী ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রহিম বলেন, গুলি তারাই করেছে। আমাদেরও ১২ থেকে ১৩ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় আমাদের নেতা গাজী ইয়াছিনকে কুমিল্লায় পাঠানো হয়েছে।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আহতদের স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এর আগে, ২৭ জানুয়ারি দুপুর দেড়টার দিকে নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর পাইলট মোড় এলাকায় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১১ জন আহত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলের এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

২৫ জানুয়ারি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় নির্বাচনী গণসংযোগ কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের পর গত রোববার রাত ৭টায় এ নিউজ লেখা পর্যন্ত হাতীবান্ধা শহরে উভয় দলের শত শত কর্মী অবস্থান নিয়েছেন। দুপক্ষের উত্তেজনার কারণে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন। এর আগে রোববার বিকালে হাতীবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নের কসাইটারী এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত ১৮ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি এক সপ্তাহের দীর্ঘ জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের পর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন-বিজয়নগর এলাকায় সন্ত্রাসীরা দিনদুপুরে তাঁর মাথায় গুলি করলে তিনি গুরুতর আহত হন। গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে হতাহত বেড়েই চলেছে। যা দিনকে দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।

জানা যায়, গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার প্রথম সাত দিনেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৬টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষের অধিকাংশই হয়েছে বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। এতে একজন নিহত হওয়াসহ অন্তত দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে ১৪৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি। এছাড়া ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ৬টি এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ২টি। পুলিশের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও ঝুঁকিপূর্ণ আসনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

এর বাইরে প্রচারকাজে বাধা প্রদানের ঘটনা ১৭ টি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি, অবরোধ-বিক্ষোভের মতো ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ২৪টি।

সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে ৩০০ আসনেই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সব আসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার শঙ্কাও রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ ভোটকেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি। এছাড়া ঢাকা মহানগরীর ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৬১৪টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারমধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজার ৫০০টি বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা এবং ৫০০টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে। এছাড়া সারাদেশে মোট ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এর মধ্যে রয়েছেন দেড় লাখ পুলিশ সদস্য, এক লাখের বেশি সেনাসদস্য এবং ৫ লাখ ৭৬ হাজার আনসার সদস্য। এসব প্রস্তুতির পরও নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ কাটেনি।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসিটিভি ও বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দুটিই চাহিদার তুলনায় অর্ধেক পাওয়া গেছে। এর ওপর পুলিশের মনোবলও এখনো পুরোপুরি ফিরেনি। এমন পরিস্থিতিতে ভোটের দিন বাস্তবে কী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনায় রাজনৈতিক নেতারা: নির্বাচনের সার্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে রাজনৈতিক নেতারাও প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

ঢাকা-৯ আসনের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাশিন প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার সমালোচনা কে ছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের নিষ্ক্রিয়তা ধীরে ধীরে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, বিশেষ করে নারীরা টার্গেট হচ্ছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা সুষ্ঠু থাকবে, তা প্রশাসনের ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেন,নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক থাকবে, তা নির্ভর করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ওপর। বর্তমানে নির্বাচন ঘিরে যে দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে, তা তাদের চোখের সামনেই ঘটছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব এসব প্রতিষ্ঠানের। তারা যদি নিষ্ক্রিয় ও ঢিলেঢালা আচরণ করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং বুঝতে হবে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা আছে—এটি প্রমাণ করতে হলে তাদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

এদিকে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসান মাহবুব জোবায়ের বলেন, এখন পর্যন্ত পরিবেশকে অতটা খারাপ বলা যাবে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে বলেই বিশ্বাস করি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রাসী বক্তব্য থেকে বিরত থাকা এই হানাহানি বন্ধের জন্য জরুরি।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

তিনি বলেন, ভোটের দিন যেভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে, তার মহড়া এখন থেকেই দেওয়া প্রয়োজন। এতে নাশকতার পরিকল্পনাকারীদের কাছে বার্তা যাবে যে তারা এসব করে পার পাবে না। একই সঙ্গে বিচার ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। কারণ কাউকে গ্রেপ্তার করার পর যদি সে একদিনেই জামিন পেয়ে যায়, তাহলে এই অরাজকতা বন্ধ হবে না।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে যাদের গ্রেপ্তার করা হবে, তারা যেন নির্বাচনের আগে মুক্তি না পায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া গেলে একটি গ্রহণযোগ্য ও ভয়হীন নির্বাচন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, কাউকে নির্বাচনী আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া যাবে না। বেআইনি কাজ করলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, প্রতিটি নির্বাচনেই সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে এমন কোনো নির্বাচন হয়নি, যেখানে কেউ মারা যায়নি, যদিও এসব ঘটনা কাম্য নয়।

তিনি বলেন, পুলিশ শুধু আশাবাদী নয়, আত্মবিশ্বাসী। ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। রাজনৈতিক চাপ, ভাঙচুর বা সন্ত্রাসী তৎপরতা—যেকোনো প্রতিকূলতার জন্য পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে এসব কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন দলের মনোনয়নকেন্দ্রিক সম্ভাব্য প্রার্থী এবং বঞ্চিত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের প্রতি প্রতিহিংসার রাজনীতি, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা বর্জন করে দলীয় ও রাজনৈতিক সহাবস্থানে থাকা উচিত।

কালের সমাজ/এসআর

Side banner
Link copied!