ঢাকা রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

রাজশাহীর দর্জিপাড়ায় ঈদ আনন্দ

জেলা প্রতিনিধি, রাজশাহী | মার্চ ১৫, ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম রাজশাহীর দর্জিপাড়ায় ঈদ আনন্দ

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে সেলাই মেশিনের শব্দ। কোথাও কোথাও সেহেরি পর্যন্ত কারিগরদের ব্যস্ত থাকতে দেখা যাচ্ছে। শুধু রাজশাহী মহানগরী নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও বাজারের ছোট-বড় টেইলার্স দোকানগুলোতেও এখন উপচে পড়া ভিড়। নতুন কাপড় হাতে নিয়ে মাপ দিতে আসছেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও। অনেকেই সময়মতো পোশাক ডেলিভারি পাবেন কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। অন্যদিকে দর্জিরা বলছেন, অর্ডারের চাপ সামলাতে অতিরিক্ত কারিগর নিয়োগ করেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

স্থানীয় কয়েকজন টেইলার্স মালিক জানান, এবার ঈদকে সামনে রেখে থ্রি-পিস, গাউন, কুর্তি, পাঞ্জাবি, পায়জামা, ফতুয়া, শেরওয়ানি ও শিশুদের পোশাকের অর্ডার বেশি। বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে কাস্টমাইজড ডিজাইনের পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ডিজাইন দেখে গ্রাহকরা ছবি নিয়ে এসে সেই অনুযায়ী পোশাক বানানোর অর্ডার দিচ্ছেন। ফলে আগের তুলনায় একটি পোশাক তৈরি করতে সময়ও বেশি লাগছে।দর্জিরা জানান, আগে যেখানে একটি সাধারণ সালোয়ার-কামিজ তৈরি করতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগত, এখন নকশা, লেইস, হাতের কাজ ও ফিনিশিং মিলিয়ে সময় প্রায় দ্বিগুণ লাগছে। রানীবাজারের একজন দর্জি বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি এ পেশায় রয়েছেন। প্রতি বছরই ঈদের আগে এমন চাপ থাকে, তবে এবার অর্ডারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

নগরীর সাহেববাজার কাপড়পট্টিতে অবস্থিত নিউ রিডেন টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ঈদ উপলক্ষে আমাদের ব্যস্ততা প্রতিবছরই থাকে। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি করি। ১০ রমজানের পর থেকেই নতুন অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। এখন হাতে থাকা অর্ডারগুলো সময়মতো ডেলিভারি দেওয়ার চেষ্টা করছি।”

সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় মানুষের মাঝে পোশাকের প্রতি সচেতনতা বেড়েছে। রেডিমেড পোশাকের পাশাপাশি মাপ অনুযায়ী আরামদায়ক পোশাকের জন্য অনেকেই এখনও দর্জির ওপর নির্ভর করছেন। তবে কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে অনেক টেইলার্স মালিক ইতোমধ্যে নতুন অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেক দোকানের সামনে ঝুলছে ‘ঈদের অর্ডার বন্ধ’ লেখা নোটিশ। তবুও পুরনো গ্রাহকদের অনুরোধে সীমিতভাবে কাজ নিচ্ছেন কেউ কেউ।

কারিগররা জানান, রোজা রেখে দীর্ঘসময় কাজ করায় তারা শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। রাত জেগে কাজ করা সহজ নয়, তবুও গ্রাহকের সন্তুষ্টির কথা ভেবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। মালিকদেরও কর্মচারীদের অতিরিক্ত বেতন ও ওভারটাইম দিতে হচ্ছে।অন্যদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় সেলাই খরচ বেড়েছে। আগে একটি থ্রি-পিস সেলাইয়ে যেখানে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা লাগত, এখন তা বেড়ে ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পাঞ্জাবি ও পায়জামার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। নগরীর ভদ্রা এলাকার বাসিন্দা সুরাইয়া আখতার বলেন, “ঈদের সময় টেইলার্সে অনেক ভিড় থাকে। তাই আমরা রোজার শুরুতেই জামার অর্ডার দিয়ে দিয়েছি। আজকে নিতে এসেছি। তবে আগের তুলনায় সেলাইয়ের খরচ বেড়েছে।

নওদাপাড়া এলাকার সম্রাট হোসেন বলেন, ঈদে আরামদায়ক পোশাকের জন্য দর্জির কাছে আমাদের আসতেই হয়। দোকানে পোশাক কিনতে গেলে মাপে পারফেক্ট হয় না। এখন ঈদ উপলক্ষে দর্জিদের ব্যস্ততা একটু বেশি, সেজন্য আমি রোজার আগেই অর্ডার দিয়েছি।
দর্জিরা বলছেন, কাপড়, সুতা, বোতাম, লেইসসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল ও দোকান ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কারণে সেলাই চার্জ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

রাজশাহী নগরীতে কয়েকশ’ ছোট-বড় টেইলার্স দোকান রয়েছে। ঈদের মৌসুমে এসব দোকানে অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক শিক্ষার্থী ও বেকার যুবক অস্থায়ীভাবে কাজ নিচ্ছেন কেউ কাটিং মাস্টারের সহকারী, কেউ বোতাম লাগানো বা ফিনিশিংয়ের কাজ করছেন। এতে তাদেরও কিছু বাড়তি আয় হচ্ছে।স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে দর্জিপাড়া ও কাপড়ের বাজারে এক ধরনের মৌসুমি অর্থনৈতিক গতি সৃষ্টি হয়। কাপড়ের দোকান, লেইস-ফিতা বিক্রেতা, বোতাম ও বিভিন্ন এক্সেসরিজ ব্যবসায়ীদের বিক্রিও বেড়ে যায়। অনেক দোকানির দাবি, ঈদের আগের শেষ ১০ দিনেই তাদের মাসিক বিক্রির অর্ধেকের বেশি হয়ে যায়।

নগরীর মর্ডান মনিকা লেডিস টেইলার্সের পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “ঈদ আসলে সবারই নতুন পোশাক প্রয়োজন হয়। এই সময় আমাদের কাজের চাপও বেড়ে যায়। আমরা চেষ্টা করি ভালো কাজ দিয়ে গ্রাহকদের সন্তুষ্ট করতে। ঈদের আর কয়েকদিন বাকি আছে, তার আগেই সব অর্ডার সম্পন্ন করার আশা করছি।

 

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!