ঢাকা মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

নিজে সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েও মানব সেবায় অনন্য ফরিদগঞ্জের টিটু হোসেন

কালের সমাজ ডেস্ক | জুন ৮, ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম নিজে সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েও মানব সেবায় অনন্য ফরিদগঞ্জের টিটু হোসেন

মানুষের জীবনে কিছু কিছু গল্প থাকে, যা কেবল একটি মানুষের গল্প নয়; বরং একটি সমাজের আশা, বিশ্বাস ও মানবতার প্রতিচ্ছবি। ফরিদগঞ্জের টিটু হোসেন তেমনই একজন মানুষ, যার জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ ও মানবসেবার গল্প আজ অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

ছোটবেলাতেই বাবা হারিয়েছেন টিটু। বাবার স্নেহ, ভালোবাসা আর নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি খুব অল্প বয়সেই তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। এরপর মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও সীমাহীন মমতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি। জীবনের শুরু থেকেই অভাব-অনটনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। কখনো বিলাসিতা নয়, বরং সংগ্রামই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

বাবার আদরহীন জীবনে মায়ের কোলেই তিনি দেখেছেন গরিব ও অসহায় মানুষের জীবন কতটা কষ্টের হতে পারে। কারণ টিটু নিজেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন। ক্ষুধার কষ্ট, অভাবের যন্ত্রণা, অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস—এসব তার কাছে কোনো গল্প নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর সেই অভিজ্ঞতাই তাকে শিখিয়েছে মানুষের দুঃখকে নিজের দুঃখ হিসেবে অনুভব করতে।

নিজের স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই টিটু নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের সেবায়। যখন অন্যরা নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্নে ব্যস্ত, তখন টিটু ছুটেছেন অসহায় মানুষের পাশে। কোনো স্বীকৃতির আশায় নয়, কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশায় নয়—শুধু মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।
আজ তিনি ফরিদগঞ্জের মানুষের কাছে একজন নির্ভরতার নাম। পেয়েছেন ফরিদগঞ্জের শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবীর তকমা। কিন্তু এই পরিচয়ের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর নিরলস পরিশ্রম, অসংখ্য মানুষের চোখের জল মুছে দেওয়ার গল্প এবং হাজারো মানবিক উদ্যোগ।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের রামদাসের বাগ গ্রামের সন্তান টিটু। সাধারণ পরিবারের একজন মানুষ হয়েও তিনি অসাধারণ হয়ে উঠেছেন তার কর্মের মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় **৫ হাজারেরও বেশি মানুষের জন্য রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন**। একজন রোগীর স্বজন যখন হাসপাতালের করিডোরে অসহায়ের মতো রক্তের জন্য ছোটাছুটি করেন, তখন অনেকের মুখে প্রথম যে নামটি আসে, সেটি হলো টিটু।

শুধু রক্তদান কার্যক্রমই নয়, অসংখ্য কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কোনো দরিদ্র বাবার মেয়ের বিয়ের আয়োজন, কোনো অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ, কিংবা কোনো পরিবারকে সংকট থেকে উদ্ধার করা—এসব কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে টিটুর নাম।

কেউ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে ফরিদগঞ্জের অনেকেই ফান্ড সংগ্রহের জন্য টিটুকেই খোঁজেন। কারণ মানুষ জানে, টিটু দায়িত্ব নিলে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। অসহায় মানুষের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরে সাহায্য সংগ্রহ করতেও তিনি কখনো দ্বিধা করেন না।

সামাজিক দুর্যোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা করোনা মহামারির মতো ভয়াবহ সময়ে টিটু ছিলেন সম্মুখসারীর একজন যোদ্ধা। যখন অনেক মানুষ ঘরে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করেছেন, তখন তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন প্রয়োজনীয় সহায়তা, সাহস ও মানবতার বার্তা।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, টিটু নিজে কোনো ধনী পরিবারের সন্তান নন। তিনি সাধারণ পরিবারের একজন মানুষ। এতসব মানবিক কাজও তিনি নিজের অর্থায়নে করেন না। কিন্তু তিনি অর্জন করেছেন মানুষের অমূল্য বিশ্বাস। ফরিদগঞ্জের অনেক ধনী ও বিত্তবান মানুষ টিটুর সততা, নিষ্ঠা ও মানবিকতার ওপর আস্থা রাখেন। তাই যখনই কোনো অসহায় মানুষের জন্য তিনি সাহায্যের আবেদন করেন, তখন অনেকেই বিনা দ্বিধায় এগিয়ে আসেন।

এই আস্থা রাতারাতি তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে তিনি মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছেন। মানুষ জানে, টিটুর হাতে দেওয়া সাহায্য সঠিক মানুষের কাছেই পৌঁছাবে। আর সেই বিশ্বাসই তাকে আলাদা করেছে সবার থেকে। টিটু শুধু সাহায্য সংগ্রহ করেন না, তিনি মানুষের হৃদয়কে মানবতার জন্য একত্রিত করেন।
টিটু নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন,

আমি গরিব, তাই গরিবের দুঃখ বুঝি। মানুষের জন্য কিছু করতে ভালো লাগে। আমার যদি সামর্থ্য হতো, তবে কাউকে আমি অসহায় অবস্থায় কষ্ট পেতে দিতাম না।

এই কয়েকটি কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তার পুরো জীবনের দর্শন। নিজের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছাই তাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
ফরিদগঞ্জের নারী সংগঠক এবং ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাবেয়া আক্তার টিটুকে নিয়ে বলেন,

টিটু সবসময় মানুষের পাশে থাকে। ওর মনে কোনো লোভ নেই। আমরা যত সামাজিক কাজ করি, সবসময় সবার আগে টিটুকে কাছে পাই।

প্রকৃতপক্ষে টিটুর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন মানবিক মানুষ। তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের পাশে দাঁড়াতে কোটি টাকার মালিক হতে হয় না, বড় পদ-পদবীও প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি সুন্দর মন, একটি মানবিক হৃদয় এবং মানুষের জন্য কিছু করার আন্তরিক ইচ্ছা।

আজ ফরিদগঞ্জে অসংখ্য মানুষ টিটুকে শুধু একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নয়, বরং একজন আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখেন। তিনি দেখিয়েছেন, দারিদ্র্য কোনো মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না; বরং মানবতার শক্তি থাকলে একজন সাধারণ মানুষও হাজারো মানুষের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

টিটু হোসেনের গল্প তাই শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। এটি মানবতার গল্প, বিশ্বাসের গল্প, এবং মানুষের জন্য বেঁচে থাকার এক অনন্য উদাহরণ। ফরিদগঞ্জের মাটি এমন একজন সন্তানকে নিয়ে নিঃসন্দেহে গর্ব করতে পারে। কারণ টিটুর মতো মানুষরাই প্রমাণ করেন—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্পদ নয়, তার মানবতা।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!