ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মহম্মদপুরে ৬৩ কোটি টাকার মধুমতি সেতু অন্ধকারে

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | জুন ১১, ২০২৬, ০৫:১২ পিএম মহম্মদপুরে ৬৩ কোটি টাকার মধুমতি সেতু অন্ধকারে

মাগুরার মহম্মদপুর ও ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার মানুষের স্বপ্ন, যোগাযোগ ও অর্থনীতির সেতুবন্ধন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মধুমতি সেতু।

 দিনের আলোয় নান্দনিক সৌন্দর্যে মুগ্ধতা ছড়ানো এই সেতু রাত নামলেই যেন পরিণত হয় এক অন্ধকার করিডোরে। ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুর একটিও স্ট্রিট লাইট গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্বলছে না। ফলে পদ্মা সেতুর সংযোগপথের এই ব্যস্ত রুটে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।

মহম্মদপুর উপজেলা সদরের মধুমতি নদীর উপর নির্মিত ৬০০ দশমিক ৭০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর উদ্বোধন করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে নির্মিত এ সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আসে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এর গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

সূত্রমতে, ৬৩ কোটি ৩১ লাখ ২৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটিতে রয়েছে ১৫০টি পাইল, ১৪টি পিয়ার, দুটি অ্যাবাটমেন্ট ও ১৫টি স্প্যান। প্রতিদিন দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ হাজারো যানবাহন এই সেতু ব্যবহার করে। কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিতে আজ সেই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোই ভুগছে অন্ধকারের অভিশাপে।

শুধু যোগাযোগ নয়, মধুমতি সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি প্রাণচঞ্চল পর্যটন কেন্দ্রও। ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবের সময় দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় জমান। নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে রেস্টুরেন্ট, বিনোদন কেন্দ্র ও ক্ষদ্র্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সেতুর উপর ও আশপাশে বসে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, আইসক্রিম ও নানা পণ্যের ভ্রাম্যমাণ দোকান। ঈদের সময় দুই পাড়ে বসে মেলা, চলে নাগরদোলা আর নৌভ্রমণ। এ কারণেই স্থানীয়দের অনেকেই এলাকাটিকে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে অভিহিত করেন।

কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় পুরো চিত্র। সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর দুই পাশে স্থাপিত সবগুলো স্ট্রিট লাইট দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সেতু এলাকা নিমজ্জিত হয় ঘন অন্ধকারে। এতে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী ও পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইউনুছ আলী বলেন, “দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সেতুর কোনো লাইট জ্বলছে না। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা ভুতুড়ে পরিবেশে পরিণত হয়। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে।”

মো. ইমামুল ইসলাম নামে এক যুবক বলেন, “সেতুর কাছেই আমার শ্বশুরবাড়ি। প্রায়ই এখানে আসি। কিন্তু সন্ধ্যার পর অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় চলাচলে ভয় কাজ করে। দ্রুত স্ট্রিট লাইটগুলো সচল করা প্রয়োজন।”

স্থানীয়দের মতে, সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দীর্ঘদিন অন্ধকারে পড়ে থাকা দুঃখজনক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী এই ব্যস্ত রুটে আলোকসজ্জা না থাকায় দুর্ঘটনা ও অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে।

মধুমতি সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীক। তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই অন্ধকার দ্রুত দূর করে সেতুটিকে আবারও নিরাপদ ও আলোকিত করে তোলা হবে।

উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. গোলজার হোসেন জানান, সেতুর বাতিগুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত লাইটগুলো পুনরায় সচল করা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী বলেন, “সার্ভিস তার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই লাইটগুলো পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করা হবে।”

 

কালের সমাজ/কে.পি

 

Link copied!