উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধান চাষ ও পরিচর্যা করতে গিয়ে আর্থিক সংকট ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে জয়পুরহাটের প্রান্তিক কৃষকদের। লিটারে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় এবার পাওয়ার টিলার মালিকরা গত মৌসুমের চেয়ে প্রতি বিঘায় ৩০০ টাকা চাষ খরচ বেশি নিচ্ছে। এ ছাড়া সার,বীজ,কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়েছে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। অথচ বাজারে ধানের দাম কম। এ অবস্থায় সরকারের কাছে ধানের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করার দাবি তাদের।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ৭০ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। যেখান থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার ৯৫৭ মে.টন ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৯৭ ভাগ জমিতে আমন চাষ সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, গত বছরের চেয়ে বিঘা প্রতি হাল চাষে খরচ বেড়েছে ৩০০ টাকা, রোপন করতে কৃষি শ্রমিকরা বেশি নিচ্ছে ৫০০ টাকা, সংকটের অজুহাতে খুচরা বাজারে সারের দাম বস্তা প্রতি বেড়েছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা, কীটনাশকের দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। আবার বীজ ও সেচ সহ অন্যান্য খরচতো আছেই।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার পুরানাপৈল এলাকার কৃষক ইসমাইল মন্ডল বলেন, এবছর আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে হয়তো এবার বিঘা প্রতি ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ২০ মণ ধান উৎপাদন হতে পারে। কিন্তু খরচ অনুপাতে ধানের নায্য দাম যদি না পাওয়া যায়, তাহলে গত আলু ও বোরো মৌসুমের মতই আমনেও লোকসান গুনতে হবে।
পাঁচবিবি উপজেলার বীরনগর এলাকার কৃষক গোবিন্দ ও লুৎফর রহমান বলেন, জমি প্রস্তুত, শ্রমিকের মজুরি, চারা, কীটনাশক ও সারের দাম—সব মিলিয়ে গত বছরের তুলনায় এবার খরচ বেড়েছে কয়েকগুন। এর মধ্যে প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ায় অনেক কৃষককে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ।
একই অভিযোগ দস্তপুর গ্রামের আদিবাসী কৃষক রবিন ও তাজপুর গ্রামের বাবুল হোসেনের। তাঁরা জানান, সার নিতে গেলে দোকানে পাওয়া যায় না। আবার পাওয়া গেলেও বেশি দাম চাওয়া হয়। এত খরচ করে ধান চাষ করে শেষে লাভ থাকবে কি না, সেটাই চিন্তার বিষয়। তাদের অভিযোগ, বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিছু ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রি করছে। কৃষি বিভাগের লোকজন যদি মাঠপর্যায়ে মনিটরিং করে তাহলে সারের দোকানদাররা বেশি দামে সার বিক্রি করতে পারবেনা।
জয়পুরহাটের চাঁনপাড়া বাজারের বিসিআইসি অনুমোদিত সারের ডিলার মেসার্স সামছুল আলম চৌধুরীর প্রতিনিধি মোঃ আজিজুর রহমান বলেন, সরকার নির্ধারিত সারের যে মূল্য তালিকা আছে আমরা সেই তালিকা অনুযায়ী সার বিক্রি করছি। তবে, চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ না পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন তিঁনি। যাঁর কারনে কৃষক পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী আমরা সার সরবরাহ করতে পারছিনা।
সরকারি ভাবে কৃষক পর্যায়ে সার বিক্রির তালিকা অনুযায়ী- প্রতি বস্তা ৫০ কেজি ওজনের ইউরিয়া সার ১৩৫০ টাকা, টিএসপি সার ১৩৫০, এম ও পি সার ১০০০ ও ডি এ পি সার ১০৫০ টাকা হিসেবে সার বিক্রির কথা থাকলেও কতিপয় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা তা মানছেন না বলে অভিযোগ কৃষকদের।
জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ.কে.এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে যদি কোনো সারের ডিলার সারের দাম বেশি নেয় তাহলে অভিযোগ পেলে সেই ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিঁনি আরোও জানান, মাঠ পর্যায়ে প্রতি বিঘা জমিতে যে পরিমানের সার প্রয়োজন তাঁর থেকে ২/৩ গুণ সার বেশি প্রয়োগ করে কৃষকেরা। এছাড়া আগামী আলু মৌসুমের সার এখন থেকেই কিছু কৃষক সার সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। যাঁর ফলে এই সমস্যাগুলো সৃষ্টি হচ্ছে।
কালের সমাজ/কে.পি

