ঢাকা বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ডলারের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশ?

কালের সমাজ ডেস্ক | জুন ১০, ২০২৬, ১২:১৬ পিএম ডলারের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশ?
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংকের প্রস্তাবের পর দেশটির ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চীনা প্রতিনিধি দলের এক বৈঠকে বিষয় দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক চাইলে সিআইপিএস প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পারবে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত কোনো আপত্তি নেই। একই সঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনাও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন, ডলারের আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক এবং বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা গভীর হয় তার ওপর।

সিআইপিএস কী?

সিআইপিএস (Cross-Border Interbank Payment System) হলো চীনের কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, যা ২০১৫ সালে চালু হয়। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে চীনা মুদ্রা রেনমিনবি (আরএমবি) বা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো।

বর্তমানে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন সুইফট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ঘটনার পর বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামোর প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সিআইপিএসকে সুইফটের একটি সম্ভাব্য বিকল্প বা পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যত বেশি লেনদেন চ্যানেল থাকবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য তত বেশি সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে সিআইপিএসে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রক বাধা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

কেন গুরুত্ব পাচ্ছে?

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি অংশীদার দেশ চীন। প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করে, অথচ রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

বর্তমানে এই বাণিজ্যের অধিকাংশই ডলারে নিষ্পত্তি হয়। ভবিষ্যতে ইউয়ানে লেনদেন বাড়ানো গেলে ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের ওপর চাপও হ্রাস পেতে পারে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু নতুন একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার কতটা বিস্তৃত হয় তার ওপর। 

তাৎক্ষণিক সুফল কতটা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সুবিধা নাও পেতে পারে। কারণ, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্যহীন; আমদানি অনেক বেশি হলেও রপ্তানি সীমিত। ফলে ইউয়ানে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ তৈরি হওয়ার সুযোগও কম।

র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকের মতে, সিআইপিএস দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিকল্প হতে পারে। তবে কেবল ইউয়ানভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করলেই বড় সুবিধা আসবে না।

তিনি বলেন, চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো ঋণ, শিল্প খাতে অর্থায়ন এবং যৌথ প্রকল্প বৃদ্ধি পেলে ইউয়ানভিত্তিক আর্থিক প্রবাহ তৈরি হবে। তখন আন্তঃসীমান্ত লেনদেন আরও সহজ ও কার্যকর হতে পারে। অন্যথায় অধিকাংশ লেনদেনের জন্য বাংলাদেশকে ডলারের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

আলোচনায় পান্ডা বন্ড

বৈঠকে পান্ডা বন্ড ইস্যুর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। পান্ডা বন্ড হলো চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা ইউয়ানভিত্তিক ঋণপত্র।

এর মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা সরকার সরাসরি চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পান্ডা বন্ড ইস্যু করলে চীনের বিশাল বন্ড বাজার থেকে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে বৈদেশিক ঋণের উৎস আরও বহুমুখী হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বিকল্প অর্থায়নের পথ খুলে যেতে পারে।

তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূলত সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাই প্রধান হবে। 

চীনের আগ্রহ, নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশকে সিআইপিএস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ নতুন নয়। ২০২৪ সালের মার্চে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং ডলারনির্ভরতা কমানোর প্রবণতা বাড়ায় বাংলাদেশও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

এদিকে চীনা এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বৈঠকেও সম্ভাব্য বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চীনা বিনিয়োগ ও প্রকল্প অর্থায়ন বাড়লে সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড উভয়ই বাংলাদেশের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। 

বিশ্লেষণ: সুযোগ আছে, তবে প্রস্তুতিও জরুরি

সিআইপিএস এবং পান্ডা বন্ড-দুটিই বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। একদিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি হবে, অন্যদিকে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী হবে।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু এখনও মার্কিন ডলার। ফলে ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার প্রকৃত সুবিধা পেতে হলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, সিআইপিএস বা পান্ডা বন্ড কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। বরং এগুলো এমন আর্থিক অবকাঠামো, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হলে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।

কালের সমাজ/এএইচবি 

Link copied!