ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩

৫০ বছরের হাহাকার মুছে এক পূর্ণতার গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক | এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ১২:১০ পিএম ৫০ বছরের হাহাকার মুছে এক পূর্ণতার গল্প

পহেলা বৈশাখ মানেই নতুনের আবাহন। কিন্তু মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার মুক্তানগর গ্রামের আম্বিয়া বেগমের কাছে এবারের নববর্ষ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়, বরং দীর্ঘ অর্ধশতকের হাহাকার মুছে এক পূর্ণতার গল্প। নরওয়ে প্রবাসী মেয়ে দুলি রোজ থুভ সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ফিরে এসেছেন মায়ের ভিটায়। এবারের বৈশাখ তাই আম্বিয়া বেগম আর দুলির কাছে এক অনন্য অনুভূতির নাম।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নরওয়ের নাগরিক দুলি রোজ। মাত্র এক বছর বয়সে ঢাকার শিশু সদন থেকে নরওয়েতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পালক মা-বাবার কাছে বড়ো হলেও মনের গহিনে লালন করতেন এই মাটির সংস্কৃতি।
গত বছর একাত্তর টেলিভিশনের সহায়তায় দীর্ঘ লড়াই আর অপেক্ষার অবসান ঘটে, দুলি খুঁজে পান তার গর্ভধারিণী মাকে। এরপর থেকেই অপেক্ষার পালা ছিলো—কবে নিজের শেকড়ে ফিরে দেশি আমেজে মেতে উঠবেন।

দুলি রোজ জানান, তিনি ইন্টারনেট আর গুগলের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, লোকজ গান আর মেলার ছবি দেখতেন। খনার বচন, চারুকলার মুখোশ, পালকি আর গাজীর পট তাকে সবসময় টানতো। এবারের নববর্ষ সরাসরি উপভোগ করতে স্বামী ফয়েন থুভকে নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন মায়ের গ্রামে।

দুলি বলেন, এদেশের নিজস্ব পার্বণ পহেলা বৈশাখ যে এতো রঙিন, তা না দেখলে বিশ্বাস হতো না। চারদিকে প্রাণের উচ্ছ্বাস। গুগল থেকে জেনেছি এটি বিশ্ব ঐতিহ্য। মাকে খুঁজে পাওয়ার পর নিজের সংস্কৃতিতে অংশ নিতেই এবার আসা।

মুক্তানগর গ্রামের বাড়িতে এখন উৎসবের আমেজ। মা আর মেয়ের ভাষা আলাদা, একজন বলেন বাংলা আর অন্যজন ইংরেজি কিংবা নরওয়েজিয়ান। কিন্তু ভাষা না বুঝলেও অনুভূতির প্রকাশ থেমে নেই। একে অপরকে ছুঁয়ে থাকা আর ইশারায় চলছে মনের আলাপ।

মায়ের সঙ্গে বর্ষবরণের প্রস্তুতির কোনো কমতি রাখছেন না দুলি। সারাদিন ঘুরে চুড়ি, টিপ আর সাজসজ্জার সরঞ্জাম কিনেছেন। নিজের জন্য কিনেছেন বৈশাখের চিরায়ত লাল-সাদা শাড়ি। শুধু নিজের জন্য নয়, মা আর পরিবারের সদস্যদের জন্য সাধ্যমতো করেছেন নববর্ষের বাজার-সদাই।

গ্রামের নারীরা দুলি ও তার স্বামী ফয়েনকে হাতভরে মেহেদি পরিয়ে দিয়েছেন নানা নকশায়। এমন আন্তরিকতায় মুগ্ধ ফয়েন থুভ বলেন, সবখানে রঙের দারুণ ছোঁয়া। এখানকার মানুষের মন মাটির মতো নরম।

দুলির মা আম্বিয়া বেগম অসুস্থ ছিলেন। দূর প্রবাসে থেকেও পারিবারিক বন্ধু ক্রিস্টোফারের সহায়তায় মায়ের চিকিৎসা ও অপারেশনের সব ব্যবস্থা করেছেন দুলি। এখন মা-মেয়ে দুজনেই সুস্থ। আম্বিয়া বেগম ভাঙা ভাঙা গলায় মেয়েকে শিবালয়ের বৈশাখী মেলার গল্প শোনাচ্ছেন।

অর্ধশত বছর ধরে মুক্তানগরের এই বাড়িতে নববর্ষ আসত এক চাপা কষ্ট আর অপূর্ণতা নিয়ে। হারিয়ে যাওয়া সন্তানের শূন্যতা আম্বিয়া বেগমকে প্রতি বৈশাখে পোড়াত। আজ সেই শূন্যতা ভরাট হয়েছে। চৈত্রসংক্রান্তির রাত পোহালেই নতুন বছর। মুক্তানগরের এই বাড়িতে এবার নববর্ষ শুধু উৎসব নয়, এক হার না মানা সম্পর্কের পুনর্মিলন। দুলি আর ফয়েন দম্পতি বারবার ফিরে আসতে চান এই প্রাণের উৎসবে।

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!