সোমবার (১৬ মার্চ) দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় ‘সাহাপাড়া খাল’ পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি বাংলাদেশে এই যে প্রায় ২০ কোটি মানুষ, এই ২০ কোটি মানুষের বেশিরভাগ থাকে গ্রাম অঞ্চলে এবং তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ বাস করে এবং তাদের প্রধান পেশা হচ্ছে কৃষি। তারা গ্রামে বাস করে, তাদের প্রধান পেশা হচ্ছে কৃষি। এবং কৃষি যদি বাঁচে তাহলে বাংলাদেশের কৃষক যদি ভালো থাকে তাহলে বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে ক্ষমতায় এসে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার কৃষক ভাইদের কথা মনে রেখেছে এবং সেই কৃষি ঋণ সুদসহ আমরা মওকুফের ব্যবস্থা করেছি।
তিনি বলেন, সমগ্র বাংলাদেশের যে খালগুলো আগে ছিল, প্রায় সকল খাল ভরাট হয়ে গেছে। আমি এখানে আসার পথে বিভিন্ন জায়গায় দেখলাম নদী পর্যন্ত ভরাট হয়ে গেছে। নদীর মধ্যে কিছু চাষবাসের কাজ হচ্ছে।
‘এই এলাকাতে যে খবর নিয়ে আমি জানলাম, এমনকি বর্ষার মৌসুমেও খরা হয়, অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যায় না।
বর্ষার মৌসুমেও অনেক জায়গায় পানির সমস্যা হয়। সেখানে চাষবাস করা যায় না।আমরা এই বর্ষার পানিটাকে আমাদের কাজে ব্যবহার করতে চাই। আমরা কৃষক ভাইদের কাজে এই পানিটা ব্যবহার করতে চাই, আমরা এই পানিটা ব্যবহার করতে চাই এমনভাবে যাতে সমগ্র এলাকার মানুষ উপকার পায়। সেজন্যই আমরা সমগ্র বাংলাদেশে আজকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখানে খাল খনন শুরু করলাম।
’
সমগ্র বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের ঘোষণা দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, নদী খাল সব বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষার সময় উজান থেকে যখন হঠাৎ করে পানি আসে তখন দেখি যে নদী-খালবিলের আশেপাশে যে বাড়িঘর আছে মানুষজনের সেগুলো ভেসে যায়, গরু-ছাগল ভেসে যায়, মানুষের কাপড়-জামা নষ্ট... হয়ে যায়। ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। এরকম সমস্যা যাতে না হয়, সেজন্য আমাদের খাল খননের কর্মসূচি।
‘শুষ্ক মৌসুমেই হোক, বর্ষা মৌসুমেই হোক, আমরা যেন আমাদের কৃষক ভাইদের পানি সরবরাহ করতে পারি। যাতে আমরা আমাদের কৃষির উৎপাদন বাড়াতে পারি। কৃষির উৎপাদন এজন্যই আমাদের বাড়াতে হবে, কারণ বাংলাদেশ বিরাট দেশ, ২০ কোটি মানুষ এই দেশে। এই মানুষগুলোর জন্য খাবার-দাবারের ব্যবস্থা... এত মানুষের খাবার কি বিদেশ থেকে আনা সম্ভব? এই খাবার আমাদের এই দেশেই উৎপাদন করতে হবে। আমাদের যেগুলো মৌলিক খাবার-দাবার, ধান-চাল যেগুলো মৌলিক খাবার-দাবার, এই দেশে উৎপাদন করতে হবে। আল্লাহর রহমতে আল্লাহ এই দেশের মাটিকে এত উর্বর করে দিয়েছেন যে আপনি যদি বীজটা রোপণ করেন, একটু পানি-টানি দেন, মোটামুটিভাবেই সেখানে ফসল ফল ধরে। কাজেই আল্লাহর নেয়ামত এই পানিটাকে আমাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে মানুষের উপকারে।’
তিনি বলেন, খালের পাশে যে জায়গাটা হবে সেখানে আমরা প্রায় সাত হাজার বৃক্ষ রোপণ করব ইনশাআল্লাহ। খালের পাশে আমরা রাস্তা করে দেব, যাতে আপনাদের হাঁটা-চলার জন্য সুবিধা হয়। এলাকার মানুষ যাতে সুন্দরভাবে হাঁটা-চলা করতে পারে। এখান থেকে সামনে যেগুলো এলাকা আছে সেখানে যাতে আপনারা যেতে পারেন।
তিনি বলেন, আমরা বলেছিলাম, এই সারা বাংলাদেশে চার কোটি পরিবার আছে। এই চার কোটি পরিবারের মায়েদের কাছে, যাদের সংসার আছে তাদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। সেই কাজটিও কিন্তু আমরা শুরু করেছি। আমি জানি, এই এলাকার কোন মা-বোন এখনো ফ্যামিলি কার্ড পাননি। তবে এতোটুকু বলতে পারি, ইনশাআল্লাহ আপনারা পাবেন, একটু সময় লাগছে কারণ সরকারের কিছু নিয়ম-কানুন আছে। পাইলট প্রজেক্ট প্রথমে শুরু করতে হয়। আমরা সেই পাইলট প্রজেক্টের কাজ শুরু করেছি। সেখানে আমরা ৩৭ হাজার মায়ের কাছে, বোনের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিয়েছি। ইনশাআল্লাহ আপনাদের চিন্তা করার কোনো কারণ নাই, এই এলাকাসহ পুরো দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ সমগ্ৰ এই রংপুর বিভাগের যত মায়েরা আছেন সবার কাছে ধীরে ধীরে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব।
‘শুধু একটু সময় প্রয়োজন। মাত্র সরকারের বয়স হয়েছে এক মাস, একটু সময় প্রয়োজন। আর একটা জিনিসও তো বুঝতে হবে, সবাই আপনারা বোঝেন যে, এই যে মধ্যপ্রাচ্যে একটা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমাদের অনেক ভাইয়েরা আছে, ওখানে চাকরি করে, তাদের নিয়েও আমরা টেনশনে আছি যে, কখন আল্লাহ না করুক কিছু যদি হয়ে যায় কারো। এর মধ্যে কয়েকজন সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের আমরা আনার ব্যবস্থা করেছি, কিন্তু সেই মানুষগুলোর কথাও আমাদের চিন্তা করতে হবে তো। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশের অর্থনীতির উপরে একটু চাপ পড়েছে। তারপরও আমরা যেই কমিটমেন্ট, যেই ওয়াদা করেছি, আমাদের মা-বোনদের কাছে যেই ওয়াদা করেছি আমরা, সেগুলো কিন্তু আমরা ধীরে ধীরে ইনশাআল্লাহ বাস্তবায়নের কাজ এরই ভেতরে শুরু করেছি।’
কৃষকদের কাছেও কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাতে করে আমরা তাদের পাশেও দাঁড়াতে পারি। আগামী মাস থেকে আমরা এটার পাইলট প্রজেক্টের কাজ শুরু করব। ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সব কৃষক ভাইয়ের কাছে, বিশেষ করে যারা ছোট কৃষক, ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষক, মধ্যম কৃষক, তাদের কাছে আমরা এই কার্ডগুলো দেব যাতে করে এই কার্ডের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন রকম সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে।
‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো। বিএনপি, শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়া ছিলেন কৃষকদের বন্ধু। আপনাদের নির্বাচিত বর্তমান বিএনপি সরকার হচ্ছে কৃষকের বন্ধু। কারণ কৃষক ভালো থাকলে, কৃষাণী ভালো থাকলে এই বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে। এই কৃষিকে আমরা শক্তিশালী ভিত্তির ওপরে, বাংলাদেশের কৃষিকে আমরা শক্তিশালী ভিত্তির উপরে গড়ে তুলতে চাই।’
এসময় উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
সরকারপ্রধান বলেন, ‘আজকে যে মাসে পাঁচ হাজার টাকা কামাই করে, আমরা চাই তার আয়-রোজগার আগামী দুই চার বছরের মধ্যে যাতে পাঁচ থেকে ইনশাআল্লাহ দশ হাজার টাকায় পৌঁছায়। আজকে যে দুই হাজার টাকা ইনকাম করে, আমরা চাই এমন পলিসি ও পদক্ষেপ নিতে, যার মাধ্যমে তার ইনকামটা ডাবল হয়ে যায়। দুই হাজার থেকে চার-পাঁচ হাজার, আগামী কয়েক মাসের বা দুই চার বছরের মধ্যে যাতে তার ইনকামটা ডাবল হয়ে যায়। এটাই হচ্ছে আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য।
বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে নিশ্চয়ই অনেকে আছেন, যাদের আত্মীয়-স্বজন বিদেশে আছে। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যখন কথা হয়, ওরা বলে না বিদেশের দেশগুলো অনেক সুন্দর? ওখানে কি জ্বিন-ভূত এসে দেশ বানায় দিয়ে গেছে? ওই দেশের মানুষই তো দেশ সুন্দর করেছে, করেছে না? ওই দেশের মানুষই তো ওদের দেশকে গড়ে তুলেছে, তাই তো? ওরা পারলে তাহলে আমরা কেন পারবো না? আমরাও ইনশাআল্লাহ পারবো।
‘এই দেশের মানুষই একাত্তর সালে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছিল। এই দেশের মানুষই ২০২৪ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে এই দেশের ছাত্র-জনতা এই দেশ থেকে স্বৈরাচার বিদায় করেছিল। কাজেই এই দেশের মানুষই শহীদ জিয়ার সময় এই খাল খননের মাধ্যমে, পানি সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করে এই দেশ থেকে বিদেশে খাদ্য রপ্তানি করেছিল। তাহলে এই দেশের মানুষ যদি এতো বড় কাজ করতে পারে, ইনশাআল্লাহ আপনারাই গড়ে তুলতে পারবেন আগামী দিনের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। শুধু আমাদেরকে পরিকল্পনা করতে হবে।’
তিনি বলেন, আমাদের সতর্ক-সজাগ থাকতে হবে। বিভিন্ন রকম কথাবার্তা বলে কারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। অনেকে আসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কিন্তু বিভ্রান্ত করতে চায়। কিন্তু আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কৃষকের উপকার করা। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে মা-বোনদের স্বাবলম্বী করে তোলা। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে এলাকার মানুষ, দেশের মানুষ, গ্রামের মানুষ কীভাবে ভালো চিকিৎসা পেতে পারে সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে লেখাপড়া করে মানুষ হতে পারে, সেটি হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কী করে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবো, সেটি কৃষিতেই হোক, সেটি শিল্পেই হোক, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই কাজগুলো যদি করতে হয় আমি কিন্তু একা পারবো না। জনগণকে সঙ্গে লাগবে। নির্বাচনে যেমন আপনারা ধানের শীষের সাথে ছিলেন, নির্বাচনের সময় যেমন আপনারা আমাদেরকে সমর্থন দিয়েছেন, এখনো কিন্তু আপনাদের সমর্থন ছাড়া আমরা এই কাজগুলো করতে পারবো না। জনগণের সমর্থন ছাড়া দেশ উন্নয়নের কাজ করা সম্ভব নয়।
‘আমরা বিশ্বাস করি জনগণই হচ্ছে আমাদের সকল ক্ষমতার উৎস। এই দেশের মালিক কারা? জনগণ।এই দেশের মালিক হচ্ছেন আপনারা। কাজেই মালিক যদি সঙ্গে থাকে, তাহলে আমরা যেকোনো কাজ ইনশাআল্লাহ করে তুলতে পারবো, যেকোনো পরিকল্পনাকে সফল করতে পারবো।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সেই বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই, যেই বাংলাদেশে মানুষ তার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। যেই বাংলাদেশে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। সেজন্যই আমি সবসময় একটা কথা বলি, সেই কথাটি হচ্ছে- ‘করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। আসুন আমরা আমাদের সেই বাংলাদেশকে গড়ে তুলি।
কালের সমাজ/কে.পি

