ঢাকা বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩

বাস ও লঞ্চের ভাড়া বাড়ালো কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক | এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম বাস ও লঞ্চের ভাড়া বাড়ালো কে?

রাজধানীর গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়ায় ‘গোল্ডেন লাইন’ নামক পরিবহনের বাস কাউন্টার। সকাল ৭টা বাজতে তখনও কিছু সময় বাকি। মধ্যবয়সী এক নারী দাঁড়িয়ে আছেন টিকেট কাউন্টারের সামনে, যাবেন বরিশালের স্বরূপকাঠি। ভাড়া নিয়ে কাউন্টারে থাকা একজনের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা করছেন এই নারী। কাউন্টারের লোক প্রতি টিকিটে ৫০ টাকা বাড়িয়ে ভাড়া চাচ্ছেন, এখানেই বিপত্তি। নারী যাত্রীর একটাই প্রশ্ন, কে কবে এই বাসভাড়া বাড়িয়েছে? তবে, কাউন্টার থেকে কোনও জবাব নেই। শুধু গোল্ডেন লাইন নয়, এমন হারে ভাড়া বেড়েছে বিভিন্ন রুটের দূরপাল্লার গাড়িতে। একইভাবে বেড়েছে লঞ্চের ভাড়াও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে দূরপাল্লার বাস ভাড়া পুনর্র্নিধারণের প্রক্রিয়া চলছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার নতুন ভাড়া নির্ধারিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি জানিয়েছে, সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো যাবে না এবং বর্তমান ভাড়াই কার্যকর থাকবে। তাহলে প্রশ্ন, বাস ও লঞ্চের ভাড়া বাড়িয়েছে কে?


সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই এ ধরনের একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধিতে সাধারণ যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কখনও কখনও তো বাগবিতণ্ডার পাশাপাশি হাতাহাতিতেও জড়িয়ে পড়ছেন তারা।

গত ১৮ এপ্রিল রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সেদিন রাত থেকে জ্বালানি তেলের এই নতুন দাম কার্যকর হয়। মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এমনকি, জ্বালানি সংকটের শুরু থেকেও কিছু বাসের স্টাফরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে আসছিল।

ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘন করে বাস ও লঞ্চে একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধি করলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিল বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তারা বলছে, ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের মূল্য একলাফে ৩৪ টাকা বৃদ্ধি করে ১১৪ টাকা করায় তখন বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ৪০ পয়সা বা ২২ শতাংশ ও লঞ্চভাড়া ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। সেই বর্ধিত ১১৪ টাকা লিটারের ডিজেলের মূল্য কয়েক দফায় কমতে কমতে ১০০ টাকা এলে সরকার তিন দফায় ৮ পয়সা বাস ভাড়া কমায়। লঞ্চেও অনুরূপ ভাড়া কাগজেপত্রে কমানো হয়। কোনও বাস ও লঞ্চে কমানো ভাড়ার সুবিধা পায়নি দেশের যাত্রী সাধারণ। এই কমানো ভাড়ার সুফল যাত্রীরা পাচ্ছে কি না সরকার কোনও তদারকি করেনি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতে আরও বলেছে, এবার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। ১৫ টাকা বাড়ানোর কারণে বাস মালিকেরা ৬৪ শতাংশ ও লঞ্চ ভাড়া ৪২ শতাংশ বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে স্ব-স্ব মালিক সমিতি।

এসব যৌক্তিক বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তুলে ধরার কারণে বারবার যাত্রী কল্যাণ সমিতিকে বাদ দিয়ে বাস ও লঞ্চের মালিক সমিতি স্বৈরাচার সরকারের ন্যায় একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে। সরকারের কিছু আমলা সাময়িক লাভবান হয়ে যাত্রী প্রতিনিধি বাদ রেখে বাস ও লঞ্চ মালিকদের এমন অযৌক্তিক ভাড়া সমন্বয়ের নামে ভাড়া বাড়িয়ে দিতে মরিয়া উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতি (যাত্রী পরিবহন) ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও, তা কার্যকর হওয়ার আগেই এই বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বরিশাল-ঢাকা নৌপথে লঞ্চের ভাড়া ৫০ থেকে শুরু করে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই গত ২০ এপ্রিল থেকে লঞ্চ মালিকরা এই বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু করেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পারাবাত লঞ্চের মালিক শহীদুল ইসলাম বলেন, “ডিজেলের দাম বাড়ায় লঞ্চ পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ভাড়া না বাড়িয়ে উপায় কি? শুধু ডিজেল দেখলে তো হবে না। ২০২২ সালের পর খুচরা যন্ত্রাংশের দামও তো বেড়েছে কয়েক গুণ।”

একই ধরণের বক্তব্য বাস মালিকদেরও। গোল্ডেন লাইন বাস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পারিচালক তোবারক হোসেন বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাড়া না বাড়ানোর কোনও বিকল্প পথ খোলা নাই। জ্বালানির পাশাপাশি গাড়ির বিভিন্ন সরঞ্জামাদির দাম বেড়েছে। এগুলো তো কারও চোখে পড়ে না। খুচরা যন্ত্রাংশ তো টাকা দিয়ে কিনতে হয়। সে খরচ তো ভাড়ার উপর দিয়েই আয় করতে হবে।”
  
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিআরটিএ’র একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারি সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।”


কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!