নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার কারণে গত ১২ দিন ধরে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য জমে ছোট ছোট ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
পৌরসভার বিভিন্ন সেকেন্ডারি বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র উপচে পড়ে আশপাশের সড়ক ও খোলা স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে আবর্জনা। পচনশীল বর্জ্য থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে বাজার, আবাসিক এলাকা ও সড়কের পাশে জমে থাকা ময়লার কারণে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বর্জ্য অপসারণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ময়লার স্তূপে মাছি, মশা ও বিভিন্ন রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটায় ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের ঝুঁকি বেড়েছে।
এদিকে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ও স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পৌরবাসী। তারা জানান, শিল্পাঞ্চল ও ঐতিহ্যবাহী জামদানী পল্লীখ্যাত তারাবো পৌরসভার এমন নাজুক পরিস্থিতি জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সচেতন মহল অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বর্জ্য সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী জামদানী শাড়ির জন্য খ্যাত তারাবো পৌরসভা রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যেন হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার পূর্বসীমায় অবস্থিত ডেমরা থানা এবং তার ঠিক বিপরীতে, শীতলক্ষা নদীর পূর্ব তীরে গড়ে উঠেছে তারাবো পৌরসভা।
দুই এলাকার মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে শীতলক্ষা নদী, যা ভৌগোলিকভাবে তাদের পৃথক করলেও যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রেখেছে। শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঐতিহ্যবাহী জামদানী শিল্পের কারণে তারাবো আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তারাবো পৌরসভা দেশের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ ও জনবহুল পৌর এলাকা। এখানে লাখো মানুষের বসবাসের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শ্রমজীবী মানুষও কাজ ও বসবাস করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন বছর ধরে পৌরসভার বর্জ্য অপসারণের দায়িত্বে ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়।

তারাবো পৌরসভায় ১২ দিন ধরে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে
সম্প্রতি নতুন করে মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন নামের এক ঠিকাদার তিন বছরের জন্য বর্জ্য অপসারের কাজ পান। কিন্তু তার দায়িত্ব পাওয়ার ১২ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু করেনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পৌরসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবাখাতে পরিকল্পনার ঘাটতি ও প্রশাসনিক শৈথিল্যের কারণে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সময়মতো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় পুরো পৌর এলাকায় পরিবেশগত সংকট তৈরি হয়েছে।
নোয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা খন্দকার মাসুম বলেন, আমরা একটি এ গ্রেড পৌরসভার বাসিন্দা হয়েও সেই মানের নাগরিক সেবা পাচ্ছি না। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ময়লা অপসারণ বন্ধ রয়েছে। রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ থেকে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
বরাবো এলাকার বাসিন্দা অনিক মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,সেকেন্ডারি পয়েন্টগুলো এখন ছোটখাটো ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়লেও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারাবো পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা নজরুল ইসলাম বাদল বলেন, প্রতিটি এলাকায় এখন ময়লার স্তুপ জমে আছে। মানুষের কাছে গেলে তারা প্রথমেই বর্জ্য সমস্যার কথা বলছেন। এটি বর্তমানে পৌরবাসীর অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য পড়ে থাকায় মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। দ্রুত বর্জ্য অপসারণ না হলে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে নতুন ঠিকাদার মোহাম্মদ আলতাফ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও তারাবো পৌরসভার প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারকে দ্রুত কাজ শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্জ্য অপসারণের জন্য বিশেষ ধরনের ভ্যান প্রয়োজন হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রয়োজনীয় ভ্যান না থাকায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
আমাদের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। কালের সমাজ/এএইচবি

