বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে ২৯৭ আসনের ফলাফল প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাদের ঘোষিত ফলাফলে বিএনপি পেয়েছে ২০৯, জামায়াত ৬৮ এবং এনসিপি ৬ আসনে জয়লাভ করেছে। এই নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ পক্ষে ভোট পড়েছে ৬৮.০৬ শতাংশ এবং ‘না’-এর পক্ষে ৩১.৯৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।
নির্বাচনের পরপরই আলোচনা শুরু হয়েছে—নতুন এমপিদের শপথ পড়াবেন কে? নির্বাচনের পর বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করবে—এটা আপাতত নিশ্চিত। কারণ যে দল বা জোট বিজয়ী হবে বা সবচেয়ে বেশি সংসদীয় আসন পাবে, তারাই সরকার গঠন করবে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে; অর্থাৎ ২০৯টি আসন পেয়েছে।
তবে নতুন সরকার গঠন কীভাবে হবে বা দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কী হবে—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, এই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বা নতুন সরকার গঠনের শুরু হবে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। তবে এই শপথের প্রক্রিয়া নিয়েও এবার তৈরি হয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা।
সাধারণত নির্বাচনের ফল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে শপথ পড়ানো হয়। কিন্তু এখানে একটি বিষয় আছে। সাধারণভাবে নির্বাচন কমিশন যে বেসরকারি ফল ঘোষণা করে, তা এক বা দুই দিনের মধ্যে এলেও সেটি আনুষ্ঠানিক ফলাফল হিসেবে গণ্য হয় না। অর্থাৎ সেই ফলাফল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে শপথ নিতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল ‘সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত’ হতে হবে এবং এরপর তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ হবে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর প্রজ্ঞাপন জারি হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব গণমাধ্যমকে ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, তার মতে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে না। গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব এক ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, সবচেয়ে দ্রুত সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। এটি তিন দিনের মধ্যেই হয়ে যেতে পারে—১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারি। আমার মনে হয় না এটি ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে। সেক্ষেত্রে এটি স্পষ্ট যে, সব ঠিক থাকলে নির্বাচনের ছয় দিনের মধ্যেই নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
শপথ কে পড়াবেন—এই প্রশ্ন উঠছে, কারণ নিয়ম অনুযায়ী অতীতে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংসদ নেই, স্পিকারও নেই। এমনকি ডেপুটি স্পিকারও কারাগারে। তাহলে উপায় কী?
এক্ষেত্রে আবারও যেতে হবে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে। সেখানে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যদি কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করতে ব্যর্থ হন বা না করেন, তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করবেন—যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই এ জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।
এই অনুচ্ছেদে মূলত দুটি উপায় বলা হয়েছে—
১. রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করানোর জন্য কাউকে মনোনীত করতে পারেন।
২. যদি তিন দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ করাতে না পারেন, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শপথ পাঠ করাবেন।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত ৫ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। সে সময় তিনি জানান, নির্বাচনের পর দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় সরকার। তিনি বলেন, এটি সরকারের নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। আমাদের সামনে দুটি বিকল্প আছে। একটি হলো রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে প্রধান বিচারপতির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এটি যদি না হয়, তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন—তিনিই শপথ গ্রহণ করাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে, তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আসলে অপেক্ষা করতে চাই না; নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই।
শপথের বিষয়টির সমাধান হলেও আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। ক্ষমতা কে এবং কীভাবে পাবেন? অর্থাৎ সরকার গঠন করবেন কে? এখানে প্রক্রিয়াটি হবে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে। তিনি যে দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতেছে—অর্থাৎ ১৫১টি বা তার বেশি আসনে জয়ী হয়েছে—তাদের সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাবেন। এখানে দলকে আমন্ত্রণ জানানো মানে দলের নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন হিসেবে প্রথমে সংসদ নেতা হবেন এবং এরপর আমন্ত্রণ পেয়ে নতুন সরকার গঠন করবেন। তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ ও নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে—সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন; রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।
মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট পদগুলোর ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভ করবেন। এর মধ্য দিয়েই আগের সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়ে নতুন সরকার গঠিত হবে। সংবিধান অনুযায়ী, শপথ গ্রহণ হয়ে গেলেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে গণ্য হবে।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে—এই সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথ গ্রহণ আবশ্যক, সে ক্ষেত্রে শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করেছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।


আপনার মতামত লিখুন :