ইহুদি রাষ্ট্র ৮০ বছরের বেশি টিকে থাকে না। সে হিসাবে ইসারাইলের আয়ু আর মাত্র দুই বছর! ২০২২ সালের এক সাক্ষাৎকারে জাতির উদ্দেশে এই একই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন দেশটির সাবেক জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক। হিব্রু ভাষার সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথকে বলেন, ‘ইতিহাসজুড়ে ইহুদিরা ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন করেনি! ধ্বংসের শুরুটা হয় ৮০ বছর পূর্তির আগেই।’ জেরুজালেম পোস্ট
ঐতিহাসিক সেই ‘অষ্টম দশক’র ডেডলাইনে পা দিয়েছে ইসরাইল। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রটির বয়স এখন ৭৮ বছর। প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক সাফল্যের দাপটে মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে তুলেছে নিজেদের শক্ত মানচিত্র। তবে এই উজ্জ্বল সাফল্যের আড়ালেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেই আজন্ম আতঙ্ক-‘অভিশপ্ত ৮০’। ইহুদি ধর্মীয় শাস্ত্র তালমুদে বলা হয়েছে-কোনো ইহুদি রাষ্ট্রই ৮০ বছরের বেশি বাঁচে না। দীর্ঘ ইতিহাসে এর প্রমাণও মিলেছে। বাইরের কোনো আক্রমণে নয়, অভ্যন্তরীণ বিভাজনেই পতন ঘটেছে রাষ্ট্রগুলোর। ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ নিয়ে সেই অদৃশ্য ভীতি ঘিরে আবারও ভবিষ্যৎ শঙ্কায় ইসরাইল।
এপি ইতিহাস বলে, বিগত প্রায় দুই হাজার বছরে ইহুদিরা যেসব সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়েছে, যেমন কিং ডেভিডের (দাউদ আ.) বা হাসমোনিয়ান রাজ্য। তার একটিও ৮০ বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি। প্রথম রাজ্য ছিল কিং ডেভিডের। এটি প্রায় ৮০ বছর টিকে ছিল। কিন্তু ৮১তম বছরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়-যিহুদা ও ইসরাইল। এতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে লাখো মানুষ। দ্বিতীয় ইহুদি রাষ্ট্র ছিল হাসমোনিয়ান রাজ্য। যা ৭৭ বছর স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু অষ্টম দশকে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে রাজ্যটি ভেঙে পড়ে এবং রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে অধীনস্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে শেষ করে দেয়।

ইসরাইলি লেখক মেনাচেম রাহাত বলেন, বর্তমান ইসরাইলও একই ঝুঁকির মধ্যে আছে। দেশকে বিভাজন ও ঘৃণার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার রূপকার হচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। লেখক সতর্ক করে বলেছেন, বাহ্যিক হুমকি যেমন সন্ত্রাস বা ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও ভেতরের ঘৃণা দেশকে ধ্বংস করতে পারে। বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৪৮ সালে। অর্থাৎ ২০২৮ সালে পূর্ণ হবে এই রাষ্ট্রের ৮০ বছর। তালমুদের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হলে আর তিন-চার বছরের মধ্যে ইসরাইল রাষ্ট্রটি ভেঙে যাওয়ার কথা। এখন সেই সময়সীমা ঘনিয়ে আসতেই ইসরাইলি সমাজ ও রাজনীতিতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এবারও কি পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে? এই ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক।
তিনি ইয়েদিয়োত আহরোনোত পত্রিকায় এক নিবন্ধে বলেন, ‘ইসরাইলি সমাজে বিভাজন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। ধর্মনিরপেক্ষ, কট্টর ধর্মভিত্তিক, আরব ও জায়োনিস্ট গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা রাষ্ট্রটির ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ ইসরাইলিদের অনেকের মনেও ভয়, তা হলে কি সেটাই ঘটতে যাচ্ছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেকরা বলছেন, ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ আসলে একটি ধর্মীয় ভাষ্য হলেও এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিও হয়ে উঠেছে। আগের ইহুদি রাষ্ট্রগুলো যেমন নিজেরা ভেঙে পড়েছে, তেমনি ইসরাইলও এখন গৃহবিরোধ, ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম মৌলবাদ এবং জাতিগত দ্বন্দ্বে জর্জরিত। ফলে এই অভিশাপকে ধর্মীয় কুসংস্কার নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা হিসাবেই দেখছেন অনেকেই। শুধুমাত্র ধর্ম কিংবা ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি এই প্রশ্ন সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে হয়তো এ নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কোনো চর্চা হতো না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ কথাটি এমন সব নেতাদের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে যার প্রবল রাজনৈতিক প্রভাব আছে।
কালের সমাজ/এসআর

