ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২

রাজনৈতিক অঙ্গনে ভোটের উত্তেজনা

নিজস্ব প্রতিবেদক | জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৯:১২ পিএম রাজনৈতিক অঙ্গনে ভোটের উত্তেজনা

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরইমধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় কাজ-কর্ম সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন এলেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভোট নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, কর্মসূচি, অভিযোগ আর সন্দেহ- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে অস্থির। এই উত্তেজনা শুধু রাজনীতির ময়দানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ইতোমধ্যে নির্বাচনি উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটকে ঘিরে উত্তেজনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন নয়। তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন এই উত্তেজনা সহিংসতা, ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তায় রূপ নেয়। তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, পারস্পরিক সংলাপ ও সহনশীলতা ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

রাজধানীর ডেমরার স্টাফ কোয়াটার এলাকায় কথা হয় নূও আলম নামে একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তার বাড়ি রুপগঞ্জের তারাবো এলাকায়। তিনি বলেন, আমি একজন আশাবাদী মানুষ। আশা করছি এবারের নির্বাচন সুষ্ঠ হবে এবং বিএনপি অনেক আসনের ব্যবধানে বিজয়ী হবে।

একইসুরে কথা বলেন যাত্রাবাড়ির ৬৪ নং ওয়াওে বাসিন্দা শাহ আলম। তবে ভিন্ন কথা বলছেন,রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার রিকশা চালক আবদুল করিম। তার বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলায়। ১২ বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন মানেই আমাদের জন্য ভয়। আগেও দেখেছি, রাজনীতি গরম হলে হঠাৎ হরতাল, মিছিল, সংঘর্ষ শুরু হয়। রাস্তায় মানুষ কমে যায়, যাত্রী পাওয়া যায় না। দুই-তিন দিন আয় না হলে ঘরে চুলা জ্বালানো দায় হয়ে পড়ে। রাজনীতি বড় লোকের খেলা হলেও ভুগতে হয় আমাদের মতো গরিব মানুষকে।

আবদুল করিম জানান, আগের কয়েকটি নির্বাচনের সময় সহিংসতার কারণে একাধিক দিন রিকশা বের করতে পারেননি। পুলিশি তল্লাশি, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর—সব মিলিয়ে আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটাতে হয়েছে। পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকলেও প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করেই সংসার চলে। নির্বাচন এলেই সেই আয়ের নিশ্চয়তা থাকে না। নিউমার্কেট এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী রাশেদা বেগমের উদ্বেগও কম নয়। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

তিনি বলেন, ভোট হওয়া দরকার, এটা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি অবস্থানে যাচ্ছে, তাতে ভয় লাগে। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে মন চায় না। বাজারে বের হলে অজানা আতঙ্ক কাজ করে কখন কোথায় কী ঘটে যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে।

তরুণদের ভাবনাতেও মিশে আছে আশা আর শঙ্কা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ভোটাধিকার একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। তরুণ প্রজন্ম হিসেবে আমরা চাই অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু যখন দেখি রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে শত্রু মনে করে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনে নেমেছে, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়। তিনি বলেন, ‘সহিংস পরিবেশ তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ সমাজ পড়াশোনা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সবকিছু অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহিন আয়েশা বলেন, ২০২৪ সালে হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে সরকার গঠিত হয়েছে এবং যে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নিয়েছে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মানের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক একটি নির্বাচন উপহার দেওয়া।

তিনি বলেন, এই দায়িত্ব এড়ানো কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ আন্দোলনকারীদের ত্যাগ ও শহীদদের আত্মত্যাগের সম্মান রাখার দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়।

তিনি আরও বলেন, ঋণখেলাপি শুধু একটি আর্থিক অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের প্রতীক। যারা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদেরকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈধতা দিলে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে লুটেরাদের হাতে তুলে দেওয়ার পাঁয়তারা চালানো হবে। তাই প্রার্থীদের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে নির্বাচন শুদ্ধ নয়, বরং গণতন্ত্রের মূল চেতনা নস্যাৎ হবে।

শহরের বাইরেও একই রকম উৎকণ্ঠা। রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক আব্দুল মালেক প্রায় ২০ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় রাজনীতি গরম হলে আমাদের কাজকর্ম থমকে যায়। সার-বীজ আনতে বাজারে যেতে ভয় লাগে। অনেক সময় পরিবহন বন্ধ থাকে। ফসল মাঠে থাকলেও ঠিকমতো পরিচর্যা করা যায় না। ব্যবসায়ীরাও এই সময়টাকে দেখেন শঙ্কার চোখে।

পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম ১৫ বছর ধরে কাপড়ের ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতা বাড়লে ক্রেতা কমে যায়। মালামাল আনা–নেওয়ায় সমস্যা হয়। অনেক সময় দোকান খোলা রাখা যায় না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অশান্ত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছোট ব্যবসায়ীরা, যাদের পুঁজি সীমিত।

এদিকে, বুধবার নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে প্রতীক বরাদ্দ ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। ইসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানান, কোনো প্রার্থীর কর্মীরা যদি আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে, তাহলে তার দায় প্রার্থীদের উপর বর্তাবে। এরইমধ্যে গত মঙ্গলবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে নির্বাচনের মাঠ থেকে ৩০৫ জন সরে যাওয়ায় চূড়ান্ত লড়াইয়ে মাঠে রয়েছেন ১ হাজার ৯৬৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির ২৯০ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২১৬, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩০, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৯, জাতীয় পার্টির (জাপা) ১৯৬ এবং গণঅধিকার পরিষদের ৯২ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নির্বাচনে তিন শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রার্থী বিএনপির বিদ্রোহী বলে জানা গেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীও স্বতন্ত্র হয়ে ভোটযুদ্ধে রয়েছেন।

কালের সমাজ/এসআর

Side banner
Link copied!