এখন বোরো মৌসুম, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আংশিকভাবে ধান কাটা শুরু হয়েছে; এরপর আউশ আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করতে হবে। কিন্তু সেচ, সার ও কৃষিযন্ত্রের সংকট কৃষকের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই মেলে বোরো মৌসুমে। প্রতিটি ফসল আবাদের ক্ষেত্রেই এখন আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, সেচের জন্য শ্যালো মেশিন, মাড়াইয়ের কাজে হারভেস্টার, জমি চাষ দিতে পাওয়ার টিলার, এমনকি ওষুধ ছিটাতেও যন্ত্রচালিত স্প্রে মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। বেশিরভাগ যন্ত্র চালাতে প্রয়োজন ডিজেল। কিন্তু তেলের সংকটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ডিজেল মিলছে না। এর মধ্যে আবার প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ডিজেলের দাম ঠিক হয়েছে ১১৫ টাকা।
অথচ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বলেছে, গ্রীষ্মের এই সময়ে তাপপ্রবাহের মধ্যে জমিতে যেন কোনোভাবেই পানির ঘাটতি না হয়। তা না হলে ধানে চিটা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষিতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। সেইসঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ঠিক রাখতে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ তাদের।
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার তিনতেলী গ্রামের কৃষক এরশাদুল হক এবার চার বিঘা (৬২ শতাংশে এক বিঘা) জমিতে ধান ও পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এক কামলা কাজ বাদ দিয়া লাইনে দৌড়াতে হয় ভোর ৪টায়। সার তুলতে দুপুর ২টা বাজে। তারপরে সংকট, এক বস্তা সার দেয়। টাকা দিয়েও সেটা আবার সময়মত পাচ্ছি না।
“এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তেল সংকট। তেলের জন্য বাজারে গিয়েছিল সকাল ৬টায়। তেল নিয়ে আসতে আসতে রাত ১০টা। সারাদিন কাজ বাদ দিয়ে কৃষকের ভোগান্তি। এখন আরেকটা সংকট তৈরি হয়েছে; সময়মত কামলা পাচ্ছি না। আবার পাইলেও প্রতিজন ৭০০/৮০০ টাকা মজুরি চায়।” এ সব কিছুই ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে জানিয়ে এরশাদ বলেন, “প্রতিমণ ধানে উৎপাদন খরচ মিনিমাম ১১০০/১১৫০ টাকা টাকা পড়েছে। বাজারে দাম ১০৫০ টাকা। প্রতি মণে ৫০ /১০০ টাকা লস (ক্ষতি) হচ্ছে আমাদের।”
তেল সংকটে ভোগান্তিতে রয়েছেন পাহাড়ি এলাকার কৃষকও। রাঙামাটির জেলার কাপ্তাই উপজেলার ধংনালা গ্রামের কৃষক ক্যাপরু মারমা তিন কানি বা ৪০ শতাংশ জামিতে চাষবাদ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের এখানে উঁচু ও নিচু দুই ধরনের জমি আছে। নিচু জমিতে প্রাকৃতিক পানির উৎস অর্থাৎ নলকূপ রয়েছে। কিন্তু সংকট তীব্র হয়েছে উঁচু জমির চাষাবাদে।
“আমার এলাকার মানুষদের তেল প্রাপ্তির উৎস হল রাইখালী বাজার। বাজারে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও দুই লিটার, এক লিটার দেয়। তাও বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে যেতে হয়। কেউ পায়, কেউ পায় না। এখন তেলের দাম বাড়ায়, ধান কাটার খরচও বেড়ে যাবে।” কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত ছয় মাসের সেচ মৌসুমে দেশে কৃষি খাতে ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন। শুধু সেচযন্ত্রেই প্রয়োজন প্রায় সাত লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি।
গড় হিসাবে প্রতি মাসে কৃষিতে ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় দুই লাখ ৯ হাজার টন, দৈনিক চাহিদা প্রায় সাত হাজার টন, যা বৃষ্টির ওপর কিছুটা নির্ভর করে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ টন। বর্তমানে মজুদ আছে এক লাখ ১৩৮৫ টন। দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার টন হলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম। এই ঘাটতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষি খাতে।
শনিবার দুপুরে কেরানীগজ্ঞের কোনাখোলার ‘আলহাজ নূর ফিলিং স্টেশনে’ তেলের জন্য অপেক্ষায় দীর্ঘসময় লাইনে ছিলেন ট্রাক্টর চালক জহির ইসলাম। সকাল সাড়ে ৯টায় পাম্পে আসা জহির বলেন, “এখন ২টা বাজে। তেল থাকলে পাব ১০ লিটার। যদি ক্ষেতে নামি, এই ১০ লিটার তেলে জমি দুই পাক চাষ দিতেই শেষ। “কৃষকরা ঘিরে ধরে; তারা জমি আবাদ করতে পারছে না। তেলের লাইনে সারাদিন চলে যাচ্ছে। ভোগান্তির মধ্যেই আছি।”
তেলের অভাবে উপার্জন কমে যাওয়ার তথ্য দিয়ে জহির বলেন, “আগে তেল পাইতাম, সারা দিনে ১০-১২ টাকা আসত। এখন দিনে ওঠে হাজার দুই।” চৈত্র-বৈশাখ (মধ্য-মার্চ থেকে মধ্য-মে) মাসে পাট বীজ বপন করা হয়। অর্থাৎ পাট চাষের মৌসুম চলছে। রৌমারী উপজেলার এরশাদের ভাষ্য, এখন ভালো পাটের দাম মেলে প্রতি মণে ৫ হাজার টাকা। ফলে চাষও বেড়েছে। লম্বা আঁশের জন্য ইউরিয়া টিএসপি এমওপি (পটাশ), জিপসাম সার দিতে হয়।
“পাট চাষে সার বেশি লাগে। ৩ শতাংশ জমিতে মিনিয়াম ২০ কেজি সার লাগে। এত সার তো পাই না।” গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চল জুড়ে আবাদ হয়েছে ভুট্টা, মরিচসহ বিভিন্ন শস্য। লাভজনক হওয়ায় বর্তমানে ভুট্টা চাষে বেশি আগ্রহ এই অঞ্চলের কৃষকদের। এখানকার দুই কৃষকও অভিযোগ করলেন, ভুট্টা চাষের জন্য পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন না। সার সংকটে ভুট্টা উৎপাদন কমে যাওয়ার অশঙ্কার কথাও বললেন চরাঞ্চলের কৃষকরা।
ওই এলাকার সুন্দরগঞ্জের ভাটি কাপাসিয়া গ্রামের কৃষক মনিরুল মিয়া জানান, “চারায় কলা (তোড়) আসছে। ভালো ভুট্টার জন্য এই সময়ে ইউরিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সার লাগে। কিন্তু এবার আগের চেয়ে ফলন অনেক কম হইছে। পর্যাপ্ত সার দিতে পারি নাই। সার দিচ্ছে না। বেশি দামে বাইর থেকে সার কিনতে হয়।” ধান ও ভুট্টা দুটোই চাষ করেছেন ফুলছড়ি উপজেলার কৃষক মনোয়ার হোসেন। তার অভিযোগ, টাকা দিয়েও সার পাওয়া যায় না। সরকার কাছ থেকে যে পরিমাণ সার মেলে, তা ‘খুবই অল্প’।
তবে গাইবান্ধার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলছেন ওই অঞ্চলের সারের কোনো সংকট নেই। “যদি কেউ অভিযোগ করে সার দিচ্ছে না, বা বেশি মূল্যে সার বিক্রি করার চেষ্টা করছে, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদেরও অভিযোগ, বোরো মৌসুম শুরু থেকে ডিলার তাদের চাহিদা মত সার দিচ্ছে না। ফলে বাড়তি দামে খোলা বাজার থেকে তাদের সার কিনতে হচ্ছে।
কাহারোল উপজেলার কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন, তার যেখানে দুই বস্তা সার প্রয়োজন, সেখানে ডিলার দিচ্ছেন এক বস্তা। বাড়তি সার তাকে বাইরে থেকে বাড়তি দাম কিনতে হচ্ছে। একই অভিযোগ দিনাজপুরের সদর উপজেলার উলিপুর গ্রামের রেজাউল ইসলামের। তিনি বলেন, তার এক একর জমির বোরো চাষের জন্য দুই বস্তা ইউরিয়া সার প্রয়োজন। ডিলার তাকে দিয়েছে এক বস্তা সার। ফলে তাকে সাড়ে ১৩ শ টাকার সার বাইরে থেকে সাড়ে ১৪ শ টাকায় কিনতে হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আফজাল হোসেনও দাবি করলেন, সারের কোনো ‘সংকট নেই’। “জেলায় বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ শতাংশ জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়ে গেছে। এক একর জমিতে বোরো রোপণ থেকে কাটা পর্যন্ত সর্বোচ্চ একশ কেজি সার প্রয়োজন। কিন্তু কৃষক এক বারেই দুই বস্তা সার নিতে চায়। এটা না পেয়ে তাদের অভিযোগ চাহিদার সার তারা পাচ্ছে না ”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯টি ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গভীর ও অগভীর নলকূপ, এলএলপি পাম্প, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার, মাড়াই-ঝাড়াই যন্ত্রসহ অন্যান্য কৃষিযন্ত্র। কম্বাইন হারভেস্টারের সংখ্যা ১০ হাজার ৭২৬টি। মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্যান্য যন্ত্র রয়েছে চার লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তুকি না পাওয়ায় দুই বছর ধরে কম্বাইন হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র নতুন করে বাজারে আসেনি। এদিকে পুরোনো যন্ত্রের একটি বড় অংশ এখন মেরামতের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে।
কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, “আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো সমন্বয় সভা করেছে। তবে এ বছর অনেক এলাকায় যন্ত্রের পাশাপাশি শ্রমিক দিয়েও ধান কাটতে হবে।” তার ভাষ্য, অচল হয়ে পড়া ফসল তোলার যন্ত্রেগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে কৃষিতে জ্বালানি ও সেচ সংকটে উৎপাদন খরচ ও খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “সার তেলসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি চাষাবাদের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগের থেকেই উৎপাদন খরচ তুলতে কৃষকরা হিমশিম খাচ্ছে। এখন তেলের সংকট উৎপাদনেও প্রভাব ফেলবে। শস্য উৎপাদনও কমবে।”
দ্রুত সংকট সমাধান ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোতে ভতুর্কি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কৃষিকাজে এই জ্বালানিটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য জ্বালানির তেলের দাম বাড়িয়ে ডিজেলের ক্ষেত্রে ভর্তিুর্কি বাড়াতে পারত সরকার।” কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং এর পরিচালক কৃষিবিদ ওবায়দুর রহমান মণ্ডলের ভাষ্য, “এখন ধান ও ভুট্টা কর্তনের সময়। তাই সেচ ও সার নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই।”
ধান ঘরে তুলতে কৃষিযন্ত্রের তেল সংকট সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, “জ্বালানি সংগ্রহ প্রক্রিয়া সহজ করতে ‘ফুয়েল কার্ড’ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। এই কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ভোগান্তি ছাড়াই সদর উপজেলার পাম্প ও অনুমোদিত জ্বালানি তেল বিক্রয় কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন। “আগে কৃষকদের ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনের জন্য প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে কৃষকেরা বোরো ধান, সবজির জমিতে সেচ দিতে পেরেছে।
এখন ফসলের জমিতে পানি দিতে ফুয়েল কার্ডও দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেলের জন্য কৃষকদের লাইনে কোনো সংকট নেই।” তবে ভিন্ন কথা বলছেন একই অধিদপ্তরের আরেক কর্র্মকর্তা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উপকরণ) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, এখন ধান ও পাট, দুই আবাদের জন্যই সেচের প্রয়োজন আছে।
কালের সমাজ/কে.পি

