মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা নবগঙ্গা নদী। আর সেই নদীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা নহাটা-বাটাজোড় খেয়াঘাট যেন দুই পাড়ের হাজারো মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
আধুনিকতার এই যুগেও প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পার হতে হচ্ছে মানুষকে। দীর্ঘ আড়াইশ’ বছরের পুরোনো এই খেয়াঘাটে এখনো নির্মিত হয়নি একটি সেতু। ফলে নদীর দুই তীরের প্রায় ২০ গ্রামের মানুষের কাছে একটি সেতু এখন শুধু উন্নয়নের দাবি নয়, বরং জীবনযাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহম্মদপুর উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র নহাটা বাজারে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত এই খেয়াঘাটের উপর নির্ভরশীল। মাগুরা সদর উপজেলার বাটাজোড়, ডাঙ্গা সিংড়া, মনিরামপুর, ডহর সিংড়া ও শিকদারপাড়া গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই ঘাট ব্যবহার করে নহাটা বাজারে আসেন। একইভাবে নদীর দক্ষিণ তীরের নারানদিয়া, বেজড়া, সালধা, নাহাট ও ঝগড়দিয়া গ্রামের বাসিন্দারাও শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও নিত্যপ্রয়োজনে নিয়মিত নদী হন।
বিশেষ করে বাটাজোড় গ্রামের দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী প্রতিদিন এই খেয়াঘাট ব্যবহার করে নহাটা বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করেন। কিন্তু যাতায়াতের পুরো ব্যবস্থাটিই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য।
বাটাজোড় গ্রামের ৭২ বছর বয়সী মো. মাহাবুবুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেইন রাস্তা থেকে খেয়াঘাট পর্যন্ত রাস্তা এতটাই খাড়া যে সুস্থ মানুষেরও ওঠানামা করতে কষ্ট হয়। পণ্য নিয়ে ওঠা তো আরও কঠিন। বাইসাইকেল কাঁধে নিয়ে উঠতে হয়। একটি সেতু হলে আমরা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতাম।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে ১০ থেকে ১২টি নৌকা দিয়ে প্রতিদিন যাত্রী পারাপার করা হয়। ভোর ছয়টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে পারাপার কার্যক্রম। জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয় পাঁচ টাকা এবং মোটরসাইকেলসহ যাত্রীদের জন্য ২০ টাকা। দিনশেষে একজন মাঝির আয় হয় গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই ঘাটে নৌকা চালানো মাঝি নূর ইসলাম বলেন, “মানুষের সেবা করতে পেরে ভালো লাগে। কিন্তু এখন তো আধুনিক যুগ। একটা সেতু হলে মানুষের অনেক উপকার হবে।”
একই সুর শোনা যায় ৬৬ বছর বয়সী মাঝি আরব আলীর কণ্ঠেও। ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে তিনি এই ঘাটে পারাপারের কাজ করছেন। তিনি বলেন, “এই ঘাটে একটা সেতু খুবই দরকার। সেতু হলে মানুষ সহজে চলাচল করতে পারবে। তখন আমি অন্য কোনো পেশা বেছে নেবো।”
স্থানীয়দের মতে, একটি সেতুর অভাবে শুধু যাতায়াত নয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী নদী পার হয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। বর্ষা মৌসুমে নদী উত্তাল থাকলে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। জরুরি মুহূর্তে রোগীদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় পরিবারগুলোকে।
এছাড়া যাতায়াতের দুরবস্থার কারণে স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মহম্মদপুরের নারানদিয়া গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ী লিটন মোল্যা জানান, নদী পার হয়ে পণ্য বহন এবং খাড়া রাস্তা বেয়ে বাজার পর্যন্ত পৌঁছানো অত্যন্ত কষ্টকর। একটি সেতু নির্মিত হলে এই অঞ্চলের কৃষি, ব্যবসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বহু বছর ধরেই তারা এই খেয়াঘাটে একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। নতুন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলেও আশাবাদী তারা। বিশেষ করে মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
তাদের বিশ্বাস, নবগঙ্গা নদীর উপর নহাটা-বাটাজোড় ঘাটে একটি সেতু নির্মিত হলে শুধু যাতায়াত সহজ হবে না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
আড়াইশ’ বছরের পুরোনো এই দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে নবগঙ্গার বুকে কবে দৃশ্যমান হবে একটি সেতু, সেই অপেক্ষায় দিন গুনছেন মহম্মদপুর ও মাগুরা সদর উপজেলার হাজারো মানুষ।
কালের সমাজ/কে.পি

