ভোরের নরম আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বাতাসে মিশে আছে এক মিষ্টি ঘ্রাণ। বাড়ির আঙিনার বকুলতলায় টুপটাপ ঝরে পড়ছে ছোট্ট ছোট্ট ফুল। নাম তার বকুল ফুল। সেই ফুল কুড়িয়ে নিতে ছোট্ট দুটি হাত ব্যস্ত হয়ে উঠেছে আপন ছন্দে। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ধোয়াইল গ্রামের এই দৃশ্য যেন হঠাৎ করেই ফিরিয়ে নেয় বহুদিন আগেকার এক হারিয়ে যাওয়া বাংলায়।
এই গ্রামের বাসিন্দা মো. ইউসুফ আলী সরদারের দুই মেয়ে, নয় বছরের ফারহানা রাফসা ও পাঁচ বছরের ফারজানা রাইসা এখনো খুঁজে নেয় প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার আনন্দ। শুক্রবার (২২ মে) ভোরে দেখা যায়, বাড়ির পাশেই রাস্তার ধারে ঝরে পড়া বকুল ফুল কুড়িয়ে লাল রঙের একটি বাটিতে জমাচ্ছে তারা। পরে আমগাছের নিচে গোল বেদীতে বসে বড় বোন রাফসা সুঁই-সুতো দিয়ে মালা গাঁথছে ছোট বোন রাইসার জন্য। পাশে বসে মুগ্ধ চোখে সেই দৃশ্য দেখছে ছোট্ট রাইসা।
দুই বোনের পরনে ছিল গোলাপি রঙের ফ্রক। বড় বোনের মাথায় গোঁজা ছিল সাদা ও লাল ফুলের স্তবক। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, ঝরে পড়া বকুল ফুল আর দুই শিশুর নির্মল হাসি মিলিয়ে পুরো পরিবেশ যেন হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত লোকচিত্র।
বাংলার সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে বকুলের সম্পর্ক বহু পুরোনো। কবিতা, গান ও লোকজ ঐতিহে-বকুল ফুল বার বার ফিরে এসেছে ভালোবাসা, স্মৃতি ও মায়ার প্রতীক হয়ে। এক সময় ভোরবেলা বকুল ফুল কুড়ানো ছিল গ্রামীণ শিশুদের নিত্যদিনের আনন্দ। কেউ আঁচলে, কেউ ছোট বাটিতে ফুল জমিয়ে মালা গাঁথতো। সেই মালা শোভা পেত খোঁপায়, হাতে কিংবা গলায়।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বিরল। মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম আর যান্ত্রিক ব্যস্ততায় শিশুদের শৈশব আজ ঘরবন্দি হয়ে পড়ছে। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কও ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ধোয়াইল গ্রামের দুই শিশুর এই বকুল কুড়ানোর দৃশ্য যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানেই শৈশবকে সত্যিকারের রঙে রাঙিয়ে তোলা।
তবুও ধোয়াইল গ্রামের সেই ভোরের দৃশ্য আশার কথাই শোনায়। দুই শিশুর বকুল ফুল কুড়ানো আর হাতে গাঁথা ছোট্ট একটি বকুল মালা যেন নিঃশব্দে বলে যায়, আবহমান বাংলার সৌন্দর্য, মায়া আর শেকড় এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
কালের সমাজ/কে.পি

