ঢাকা রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩

হাট-বাজারেই দেয়া হচ্ছে সব রোগের দাওয়াই!

হাসনাত হান্নান তামিম, মহম্মদপুর (মাগুরা) | মে ২৩, ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম হাট-বাজারেই দেয়া হচ্ছে সব রোগের দাওয়াই!

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গেছে আধুনিক চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য তথ্য। হাতে হাতে স্মার্টফোন, অনলাইন পরামর্শ আর হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ সত্ত্বেও এখনো গ্রামীণ জনপদজুড়ে রমরমিয়ে চলছে তথাকথিত ‘দাওয়াই’ বাণিজ্য। হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ড কিংবা রেলস্টেশন ঘিরে মাইক হাতে ভ্রাম্যমাণ ক্যানভাসারদের চটকদার প্রচারণায় প্রতিদিনই প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

গত শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদর বাজারের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শহীদ রওশন মার্কেটের সামনে দেখা যায় এমনই এক দৃশ্য। রাস্তার পাশে সাজানো কাঁচের বয়ামে রঙিন শেকড়-বাকড়, ফল-ফলাদি, পাউডার, হালুয়া, সালসা, বড়ি ও নানা ধরনের তরল পদার্থ। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক ক্যানভাসার মাইকে উচ্চস্বরে প্রচার করছেন ‘সব রোগের মহৌষধের’ গল্প। তার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিভিন্ন বয়সী উৎসুক মানুষ।

ক্যানভাসারদের ভাষা ও উপস্থাপনার ধরন এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই প্রভাবিত হয়ে পড়েন। আমাশয়, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রিক, শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিস, বাতব্যথা থেকে শুরু করে চর্ম ও গোপন রোগের মতো জটিল সমস্যাও নাকি কয়েক দিনের মধ্যেই নিরাময় সম্ভব; এমন দাবি করা হয় প্রকাশ্যে। চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে দীর্ঘ গবেষণার পরও বহু রোগের স্থায়ী সমাধান খুঁজছে, সেখানে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হওয়া এসব ‘দাওয়াই’কে মহা সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কম খরচে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় অনেকেই এসব ভ্রাম্যমাণ ওষুধ বিক্রেতার কাছে ভিড় করেন। বিশেষ করে বাতব্যাথা, গোপন ও চর্মরোগের মতো সংবেদনশীল সমস্যায় অনেকে চিকিৎসকের কাছে যেতে সংকোচ বোধ করেন। এই মানসিক দুর্বলতাকেই কাজে লাগান ক্যানভাসাররা। তারা এমনভাবে রোগের ভয় ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন, যেন ওই মুহূর্তেই দাওয়াই না কিনলে বড় বিপদ ঘটবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অবৈজ্ঞানিক ও অননুমোদিত ওষুধ স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি। অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত হালুয়া, সালসা কিংবা ভেষজ ওষুধে গোপনে স্টেরয়েড, উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক, এমনকি পারদ, সিসা বা যৌন উত্তেজক উপাদান পর্যন্ত মেশানো হয়। ফলে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে তা কিডনি, লিভার ও হৃদযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভুল ও বিলম্বিত চিকিৎসার কারণে সাধারণ রোগও অনেক সময় জটিল আকার ধারণ করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুসংস্কার, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং সহজলভ্যতার কারণে এই অপচিকিৎসা এখনো টিকে আছে। শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, দেশের বড় বড় শহরের বাস টার্মিনাল, ফুটপাত ও জনবহুল এলাকাতেও নিয়মিত বসছে এসব ভ্রাম্যমাণ ‘দাওয়াই’ বাজার। অথচ প্রচলিত আইন অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া প্রকাশ্যে ওষুধ বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ।

স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত প্রশাসনিক অভিযান এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি না হলে এই ‘দাওয়াই’ বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষকে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই কমবে অপচিকিৎসার ভয়াবহ ঝুঁকি।

এ বিষয়ে মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. কাজী মো. আবু আহসান বলেন, এই ধরনের তথাকথিত হালুয়া ও সালসায় অনেক সময় ক্ষতিকর স্টেরয়েড, সস্তা পেইনকিলার বা মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান মেশানো হয়। সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে তা কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। ভুল ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার কারণে অনেক সাধারণ রোগও পরে জটিল হয়ে যায়। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কুসংস্কার দূর করা অত্যন্ত জরুরি।

 

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!